নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ মার্চ বগুড়া-১ আসনের উপনির্বচন। আর নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসছে নির্বাচন কমিশনে দেওয়া প্রার্থীদের হলফনামা নিয়ে কৌতূহল ও প্রশ্ন জন্ম নিচ্ছে ভোটারদের মাঝে। হলফনামায় উল্লিখিত প্রার্থীর সম্পদ বিবরণীর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে। হলফনামায় প্রার্থীরা কতটুকু সত্য তথ্য দিচ্ছেন, তথ্য প্রদানে প্রার্থীরা কৌশল বা প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন কি না এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে সর্বত্র। এতে করে নির্ভরতার জায়গাটুকু আর থাকে না বলেই মনে করছেন ভোটাররা।
নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীদের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ব্যাপারে হলফনামা দিতে হয়। তাতে মামলা, ব্যবসা বা পেশা, প্রার্থী ও তার ওপর নির্ভরশীলদের আয়ের উৎস, সম্পদ ও দায়ের বিবরণী, ঋণ ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করতে হয়। এসব তথ্য জনসম্মুখে প্রচারের বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।
বগুড়া-১ আসনের উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ছয়জন প্রার্থী। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনে (ইসিতে) জমা দেওয়া হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন অঢেল অর্থবিত্তের মালিক ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও রাজনীতিক, যাদের হলফনামা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। যারা প্রার্থী হয়েছেন তাদের হলফনামায় উল্লিখিত সম্পদ বিবরণীর তথ্য ও বাস্তব তথ্যের মধ্যে বৈশাদৃশ্য নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে। অনেক প্রার্থী তথ্য ঘেটে দেখা যাচ্ছে, হলফনামা অনুযায়ী আয় কমলেও বেড়েছে সম্পদের পরিমাণ। বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হওয়ায় প্রার্থীদের নীতি-নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাহাদারা মান্নানের দাখিল করা হলফনামা থেকে জানা গেছে, স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৪ কোটি ৯৬ লাখ ৫৪ হাজার ২৪২ টাকা। অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছেন ৪ কোটি ৯৯ লাখ ১১ হাজার ৭১১ টাকার। আর বার্ষিক আয় ৩৫ লাখ ৪৫ হাজার ১৭১ টাকা।
কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনে প্রয়াত সাংসদ আবদুল মান্নানের দাখিল করা হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা দেখা গেছে, সেখানে সাংসদের স্ত্রী সাহাদারা মান্নানের স্থাবর-অস্থাবর মিলে ১ কোটি ৬১ লাখ ৪৭ হাজার ৯২৯ টাকার সম্পদ ছিল। ব্যাংকে ছিল ২৮ হাজার ৬২৮ টাকা।
১১বছরের ব্যবধানে স্থাবর সম্পদ প্রায় তিন গুণ বেড়ে হয়েছে ৪ কোটি ৯৬ লাখ ৫৪ হাজার ২৪২ টাকা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ভোটার বলেন, হলফনামায় দেয়া যা স্থাবর আর অস্থাবর মিলে যে সম্পদ দেখানো হয়েছে। বাস্তবে পরিমান আরো দ্বিগুন হবে। জনগনকে ধোকা দেয়া ছাড়া আর কিছুই নয় দাখিল করা হলফনামার সম্পদ বিবরন।
বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ও জেলা বিএনপির সদস্য এ কে এম আহসানুল তৈয়ব জাকিরের হলফনামা থেকে জানাগেছে, তার নামে স্থাবর–-অস্থাবর মিলে প্রায় দুই কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। স্ত্রীর নামে রয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টাকার সম্পদ। কিন্তু ১১ বছর আগে এই নেতার স্থাবর-অস্থাবর মিলে ৯৪ লাখ ৪৪ হাজার ২৫০ টাকার সম্পদ ছিল।
তবে তৈয়ব জাকিরের হলফনামায় দাখিল করা সম্পদ বিবরনি অনুসন্ধানে দেখো গেছে, বিগত ১১ বছরে বিরোধী দলে থাকাকালিন সময়ে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ নাশকতার ২৬টি হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি থেকে তিনি অব্যহতি পেয়েছেন। এখনও ১০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার কারণে কখনও পালাতক আবার কখনও হাজাতবাস থাকতে হয়েছে তাকে। আর দৃশ্যমান কোন ব্যবসাও করতে পারেননি। কিন্তু সম্পদের পরিমান বেড়েছে কয়েক গুন।
ভোটারদের অনেকেই মনে করছেন জাতীয় সংসদ এখন বিপুল অর্থ লাভের কারখানা। সেখানে ভিড় জমাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সব স্তরের ক্ষমতাশালী লোকজন। তাই অঢেল অর্থের হিসাব লুকিয়ে নানা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে যেনতেনভাবে তারা সংসদে যেতে চান। তাই প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামা যথাযথ তদন্ত চায় সাধারন ভোটাররা।

জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোকছেদুল আলমের দাখিল করা হলফনামা থেকে জানা গেছে, অস্থাবর সম্পদের পরিমান সাড়ে ৮ লাখ টাকা। আর স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ১৬ বিঘা কৃষি জমি। দশমিক ৭ শতাংশ বসতভিটা আর ৫ লাখ টাকা ব্যায়ে টিন সেড নির্মানাধীন বাড়ি। এছাড়া স্ত্রীর নামে রয়েছে নগদ ১ লাখ টাকা আর ২০ হাজার টাকার স্বর্নালংকার।
খেলাফত আন্দোলনের বটগাছ প্রতিকের প্রার্থী নজরুল ইসলামের হলফনামায়, স্থাবর ও অস্থাবর মিলে ২১ লাখ ১ হাজার টাকার সম্পদ উল্লেখ করা হয়েছে। আর স্ত্রীর স্বর্নালংকারসহ ৪ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে।
বাঘ মার্কা প্রতিক প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি) এর প্রার্থী মো. রনি হলফনামায় স্থাবর ও অস্থাবর মিলে উল্লেখ করেছেন ১২ লাখ ৯০ হাজার টাকার সম্পদ। এর মধ্যে নগদ দেখানো হয়েছে ৮ লাখ টাকা। স্ত্রী’র উপহার হিসেবে পাওয়া স্বর্নালংকার দেখানো হয়েছে ৪০ ভরি।
ট্রাক প্রতীক স্বতন্ত্র প্রার্থী ইয়াসির রহমতুল্লাহ ইন্তাজ নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামায় স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমান উল্লেখ করেছেন ২৯ লাখ ৭হাজার ১৫৬ টাকার।
স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, দুর্নীতি দমন কমিশন খতিয়ে দেখলে এ সম্পদের পরিমাণ আরও বাড়বে। প্রার্থীদের দেওয়া তথ্যের ওপর পূর্ণ আস্থা নেই তাদের। দুদক বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড খতিয়ে দেখতে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের খোঁজ পাওয়া যাবে অধিকাংশ প্রার্থীরই। আর যেসব প্রার্থী গত ১১ বছরে নিজেদের অর্থের পরিমাণ বাড়িয়েছেন, সরকারি সুবিধা ব্যবহার করে বিপুল সম্পদের মালিক বনেছেন তাদের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারি বাড়ানো দরকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here