SAMSUNG CAMERA PICTURES

নিজস্ব প্রিতেবদক
স্থানীয়দের কাছে বগুড়া এখন যানজটে শহর হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মূল সড়কে যানজট লেগেই থাকছে। ছোট-বড় গাড়ির যত্রতত্র পার্কিং, প্রধান সড়কের দুই পাশে ভ্রাম্যমাণ দোকান, ফুটপাতে ভাসমান দোকান, মোড়ে মোড়ে সিএনজি ও অটোরিকশার অস্থায়ী স্ট্যান্ডের কারণে শহরে যানজটই যেনো স্থায়ী রূপ নিয়েছে।
অথচ করোনা ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া রোধে জনসমাগম কম করতে বলা হয়েছে, জেল প্রশাসন, পুলিশ সুপার ও পৌর মেয়রের পক্ষ থেকেও। গত কয়েকদিন ধরে শহরের যেকোনো স্থানে সভা সমাবেশ নিষিদ্ধও করা হয়েছে। এই বিষয়ে প্রতিদিন মাইকিংও করা হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে খুব বেশি সচেতনতা দেখা যাচ্ছে না। শহরের যান চলাচলের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ আনাও যাচ্ছে না। অথচ এর মধ্যেই বগুড়ায় ৪৩৮ জন বিদেশ ফেরতকে হোম কোয়ারেন্টাইন থাকার কথা জানিয়েছেন জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরের সবচেয়ে বেশি যানজটপূর্ণ এলাকাগুলো মধ্যে রয়েছে সাথমাথা বীরশ্রেষ্ঠ স্ক্রয়ার মোড়, দত্তবাড়ি, বড়গোলা, থানা মোড়, ইয়াবুবিয়া স্কুল মোড়, রাজাবাজার রেলগেটে, থানামোড় রেলগেট, আজিজুল হক কলেজ রেলগেট, তিনমাথা রেলগেট, নামাজগড়, টিনপট্টি মোড়, বনানী মোড়, চেলোপাড়া এলাকায়। এ ছাড়া কাঁঠালতলাও থাকে দিনভর যানজট।
গত ১২ থেকে ২১ মার্চ পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় জরেজমিন পরিদর্শন করেন এই প্রতিবেদক। ঘুরে দেখা গেছে, শেরপুর সড়কের সড়কের দুই লেনই দখল করে দাড়িয়ে রয়েছে মিনিবাস, সিএনজি, অটোরিকশা। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সড়কে দাড়িয়ে রয়েছেন ব্যাটারিচালিত রিকশা। মাঝে-মধ্যে এসব ছোটবড় গাড়িগুলো আড়াআড়িভাবেও রাখা হয়। শেরপুর সড়কের মফিজ পাগলা মোড়, ঠনঠনিয়া, পিটিআই, বগুড়া সরকারি কলেজ, ইয়াবুবিয়া স্কুল মোড় এলাকায় অস্থায়ীভাবে সিএনজি, ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোথামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করতে দেখা গেছে।
শেরপুর সড়কের ইয়াকুবিয়া মোড়ের উপর সিএনজি থামিয়ে যাত্রী তুলছেন রুহুল আমীন। তার পেছনে আরও কয়েকটি সিএনজি ও অটোরিকশা এসে ওই সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়। মোড়ের উপরই কথা হয় তার সাথে। রুহুল আমীন বলেন, সড়কের উপর যাত্রী তোলা কিংবা স্ট্যান্ডের বিষয়ে আমাদের কোনো দোষ নেই। রাজনৈতিক নেতারা সড়কের ওপরই আমাদের স্ট্যান্ড বানিয়ে দিয়েছেন। আমরাও গাড়ি থামিয়ে যাত্রী নামাচ্ছি ও ওঠাচ্ছি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কতৃপক্ষ বলছে, বগুড়া শহরে নিবন্ধিত সিএনজিচালিত অটোরিকশা রয়েছে পাঁচ হাজার ৬৫৮ টি। অনিবন্ধিত অটোরিকশা আছে আরও ১৫ হাজার। এসব যানবাহনগুলোর মালিকরা ইচ্ছেমতো শহরের বিভিন্ন স্থানে স্ট্যান্ড গড়ে তুলছেন।
শহরের স্টেশন সড়ক চাল লেনের। এই সড়কের দুই লেনই দখলে সিএনজির দখলে। মাঝে মাঝে মিনিবাস ও ট্রাক। এর চেয়ে ভয়াবহ চিত্র কবি নজরুল ইসলাম সড়কের। রিকশা আর ফুটপাতের দোকানের কারণে এই সড়কে সাধারণ যাত্রীরা হেঁটে যেতেও পারেন না। সড়কে থেমে থেমে চলছে যানবাহনগুলো। তবে এই সড়কে বেশি যানজট সৃষ্টি করে অনিয়ন্ত্রিক অটোরিকশা। এই সড়কে অন্তত ১৪ জন যাত্রীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার বাদে অন্য দিনগুলোতে সকাল ৯ টার পর থেকে দুপুর পর্যন্ত যানজট লেগেই থাকে। এতে বেশি সমস্যার মুখে পড়ে শিক্ষার্থীরা।
ট্রাফিক পুলিশের একটি সূত্র বলছে, জেলায় অন্তত ১৫ হাজার ব্যাটারি চালিত ইজিবাইক রয়েছে। ইজিবাইক চলে শহরের শেরপুর সড়কের সাতমাথা থেকে বনানী, গোহাইল সড়কে সাতমাথা থেকে ফুলদিঘী, সার্কিট হাউজ মোড় থেকে মালতিনগর, চেলোপাড়া থেকে সাবগ্রাম, চকযাদু সড়ক থেকে চারমাথা, বড়গোলা টিনপট্টি হয়ে বারোপুর ঝাউতলা থেকে মাটিডালি পর্যন্ত।
অটোরিকশা আর সিএনজির কারণে শহরে বেশি যানজট বলে মনে করেন পথচারী আব্দুল আলিম। তিনি বেসরকারি একটি ব্যাংকে জুনিয়র অফিসার পদে চাকুরি করেন। তিনি বলেন, এ ছাড়া শহরের প্রবেশদ্বারের সবকটি পথে ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটো, সিএনজি ও মিনিবাসের দাপট বেশি। শহরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ১ কিলোমিটার পথ যেতে অনেক সময় লাগে ঘণ্টার বেশি।
আলিম আরও বলেন, অফিসের কাজে সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে দত্তবাড়ি থেকে রিকশায় উঠে সাথমাথায় আসেন তিনি। রাস্তা ফাঁকা থাকলে এই পথ আসতে তার ৫ মিনিট সময় লাগার কথা। কিন্তু যানজটের কারণে সাথমাথায় আসতে সময় লাগে প্রায় আধা ঘণ্টা। এই যানজটের কারণে হিসেবে তিনি শহরের বুক চিরে চলে যাওয়া রেললাইনকে উল্লেখ করেছেন।
রেললাইন বগুড়া শহরেকে দুভাগে ভাগ করেছে। মূলত শহরের মাঝখান দিয়ে রেললাইন। বগুড়ার উপর দিয়ে রেল চলাচলের সময় থমকে যায় শহরের মানুষের গতিপথ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বগুড়ার উপর দিয়ে ২৪ ঘণ্টায় ১৬ বার ট্রেন আসা-যাওয়া করে। আর এই আসা-যাওয়ায় প্রতিবার সড়কের সিগন্যাল গুলোতে ৩০ মিনিট চলাচল বন্ধ থাকে। বিশেষ করে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৬ বার সিগন্যালে ৮ ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। ফলে যানজট পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
বগুড়া রেলের স্টেশন মাস্টার আবুল কাশেম জানান, সকাল থেকে ৮ টি ট্রেন দুইবার বগুড়া শহরের উপর দিয়ে যাতায়াত করে। এতে সর্বমোট ১৬ বার আসা-যাওয়া করে। নিরাপত্তার স্বর্থেই লেভেল ক্রসিং দেয়া হয়েছে। এতে যানজটে কিছুটা হলেও প্রভাব পরে।
উত্তরাঞ্চলের ১১ জেলার প্রবেশপথ বগুড়া। এ অঞ্চলের ১৬ জেলার মধ্যে সবচেয়ে জনবহুল শহর বগুড়া। শহরের ব্যবসায়ীদের মতে, দিনে ৩-৪ লাখ মানুষ বিভিন্ন এলাকা থেকে এই শহরে আসা-যাওয়া করছে। এ ছাড়া শহরের চারপাশের বাইপাস সড়ক পথে প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করে। এর ফলে শহরের ভিতরে ও বাইরে যানজট লেগেই থাকে। শহরের মধ্যে দিনরাত মালবাহী ট্রাক ও দিনের বেলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গাড়ি যাতায়াতের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি ও ব্যক্তিগত যানবাহন রাস্তার পাশে যেখানে-সেখানে পার্কিং করায় যানজট বাড়ছে। বাইপাস রোডে যানবাহনের চাপে যানজট সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে প্রথম বাইপাস সড়কের তিনমাথা রেলগেট ও আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সংলগ্ন চারমাথা, বনানী, মাটিঢালী এলাকায় মহাসড়কে যানজট সৃষ্টি হয়। তবে দ্বিতীয় বাইপাস সড়কে যানবাহন যানজট নেই।
এ ছাড়া শহরে সাথমাথা সংলগ্ন শপ্তবদি মার্কেটের নিচের ফুটপাতে ভ্রাম্যমান দোকানপাট বসছে প্রতিদিনই। ফলে সড়কই এখন পার্কিং ব্যবস্থা হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা গৌর গোপাল গোস্বামী বলেন, ব্যস্ততম এই শহরে এত এতই যানজট আমরা সড়কের এপাশ থেকে ওপাশে যেতে পারি না। তিনি মনে করেণ সকের মধ্যে পার্কিং, ফুটপাত দখল, অতিরিক্ত ব্যাটারি চালিত রিকশাই যানজটের মূল কারণ।
তবে যানটপূর্ণ্য এসব পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে। বগুড়া ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (টিআই) সালেকুজ্জামান জানান, আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি শহরকে যানজট মুক্ত রাখতে। এছাড়া শহর বগুড়া শহর একটি ব্যবস্ততম শহর। মাঝে-মধ্যে একটু যানজট লেগে যায়। তবে তিনি জানান, আমাদের প্রত্যেক নাগরিককে আরও সচেতন হতে হবে। তাহলে যানজট তেমন থাকবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here