নিজস্ব প্রতিবেদ,   বিশ্বজুড়ে আতঙ্কের নাম কোভিড-১৯ নামক করোনাভাইরাস। ইতোমধ্যে বাংলাদেশেও ২৭ জন করোনাভাইরাস রোগী পাওয়া গেছে এবং ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

প্রতিরোধমূলক প্রক্রিয়ার মধ্যে না থাকলে যেকোনো মানুষ করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হতে পারেন। আশ্বস্তের খবর হচ্ছে, ভাইরাসটিতে সংক্রমিত অধিকাংশ মানুষই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। কিন্তু কিছু মানুষের কোভিড-১৯ থেকে তীব্র অসুস্থতা ও মৃত্যুর বাড়তি ঝুঁকি রয়েছে। এখানে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে যাদের মারাত্মক পরিণতিতে ভোগার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে তাদের সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

বয়স্ক মানুষ: চীনের রোগ প্রতিরোধ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুসারে, করোনাভাইরাস সংক্রমণে ৮০ বছর ও তদোর্ধ্ব বয়সের মানুষদের মধ্যে মৃত্যুহার সর্বোচ্চ ছিল। চীনে ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করোনাভাইরাস সংক্রমণে মৃত্যুর সার্বিক হার ছিল ০.৯ শতাংশ, যেখানে বয়স্ক মানুষের মৃত্যুহার ছিল ১৪.৮ শতাংশ। বয়স ৬৫ বছর থেকে হিসাব করলে এ মৃত্যহার আরো বেশি। হাউসটন মেথডিস্ট হসপিটালের প্যাথলজি অ্যান্ড জিনোমিক মেডিসিন বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর এস. ওয়েসলি লং বলেন, ‘করোনাভাইরাস সংক্রমণে বেশি হারে বয়স্ক মানুষ মারা যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, বৃদ্ধ বয়সে অভ্যন্তরীণ অর্গানগুলো আগের মতো ভালোভাবে কাজ করতে পারে না। এছাড়া বয়স বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও (ইমিউন সিস্টেম) কমতে থাকে।’ যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজের প্রধান অ্যান্থনি ফসি ১৩ মার্চ এক নিউজ কনফারেন্সে বলেন, ‘বয়স্ক মানুষদের ইমিউন সিস্টেম অল্প বয়সি মানুষদের মতো শক্তিশালী নয়।’

হৃদরোগী: চীনের করোনাভাইরাস সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, হার্ট ও রক্তনালির রোগ রয়েছে এমন মানুষদের মধ্যেও করোনাভাইরাস সংক্রমণে মৃত্যুহার বেশি ছিল। হৃদরোগীদের মধ্যে কোভিড-১৯ এ মৃত্যুহার ছিল ১০.৫ শতাংশ। দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ রক্তচাপের মানুষদের মধ্যে মৃত্যুহার ছিল প্রায় ৬ শতাংশ। নিউ ইয়র্ক সিটির লিনক্স হিল হসপিটালের ইমার্জেন্সি ফিজিশিয়ান রবার্ট গ্লেটার বলেন, ‘ভাইরাসটি শুধু হার্টের পেশি নয়, রক্তনালিকেও আক্রমণ করার সম্ভাবনা রয়েছে।’ আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসপাতালে ভর্তিকৃত ৪০ শতাংশেরও বেশি কোভিড-১৯ রোগীর কার্ডিওভাস্কুলার ও সেরিব্রোভাস্কুলার রোগ অথবা হার্ট, হার্টের রক্তনালি ও মস্তিষ্কের রক্তনালি সংক্রান্ত রোগ ছিল, যেমন- স্ট্রোক। ভাইরাসটি ধমনীতে সঞ্চিত চর্বি বা প্লেককে প্রভাবিত করে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

ফুসফুস রোগী: বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, যেসব লোকেরা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রীয় রোগে ভুগছেন তাদের নতুন করোনাভাইরাস সংক্রমণ জনিত জটিলতার ঝুঁকি বেশি। করোনাভাইরাস সংক্রমণে যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের মধ্যে ৬.৩ শতাংশের শ্বাসতন্ত্রীয় সমস্যা ছিল। ভাইরাসটি শ্বাসক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত স্ট্রাকচার ও টিস্যুতে আক্রমণ করে থাকে। জটিলতার মধ্যে শুধু তীব্র নিউমোনিয়া নয়, অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিন্ড্রোমও (এআরডিএস) ডেভেলপ হতে পারে- এআরডিএসে ফুসফুসের টিস্যু পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না, বলেন ডা. গ্লেটার। যেসব ফুসফুসীয় রোগ কোভিড-১৯ জটিলতার উচ্চ ঝুঁকি বহন করে তা হলো অ্যাজমা ও ক্রনিক অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি)। সিওপিডির মধ্যে ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস ও এম্ফিসেমা উভয়ই রয়েছে। সিওপিডির প্রধান কারণ হচ্ছে ধূমপান। তাই যারা বছরের পর বছর ধরে ধূমপান করে আসছেন তাদেরও করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে সৃষ্ট জটিলতার বাড়তি ঝুঁকি রয়েছে। ডা. লং বলেন, ‘করোনাভাইরাস সংক্রমণের আরেকটি ঝুঁকি হচ্ছে অ্যাজমা। ইতোমধ্যে উপসর্গ প্রকাশ পায়নি এমন অ্যাজমা রোগীদের ফুসফুসের কার্যক্রমও কিছু না কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শ্বাসতন্ত্রের যেকোনো সংক্রমণে অ্যাজমা রোগীদের ফুসফুসে বায়ু চলাচল নালিতে প্রদাহ হয়ে অ্যাজমা অ্যাটাক হতে পারে।’

ডায়াবেটিস রোগী: ডায়াবেটিস ও অন্যান্য এন্ডোক্রাইন ডিসঅর্ডার রয়েছে এমন মানুষদের করোনাভাইরাস সংক্রমণে তীব্র অসুস্থতা ও মৃত্যুর বাড়তি ঝুঁকি রয়েছে। চীনে ডায়াবেটিস রোগীদের কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুহার ছিল ৭.৩ শতাংশ। টাইপ ১ ডায়াবেটিস ও টাইপ ২ ডায়াবেটিস উভয় রোগীদের করোনাভাইরাস সংক্রমণ জনিত জটিলতার ঝুঁকি একই। ইন্ডিয়ানার ওয়েস্ট লাফায়েট্টতে অবস্থিত পুর্ডু ইউনিভার্সিটি স্কুল অব নার্সিংয়ের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর লিবি রিচার্ডস বলেন, ‘ডায়াবেটিস রোগীদের কিছু মারাত্মক জটিলতা থাকতে পারে। ডায়াবেটিসকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ না করলে এসব জটিলতা সৃষ্টি হয়। তাই তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। তাদের শরীর ইতোমধ্যে বিপর্যস্ত বলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধে তেমন লড়াই করতে পারে না।’

ইমিউন সিস্টেম দুর্বলকারী ওষুধ ব্যবহারকারী: যারা ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করতে ইমিউন সাপ্রেসিং ড্রাগস ব্যবহার করেন তাদের পক্ষে কোভিড-১৯ ও এর জটিলতার বিরুদ্ধে লড়াই করা কঠিন হয়ে পড়ে। শরীর যেন প্রতিস্থাপনকৃত অর্গানকে রিজেক্ট করতে না পারে তার জন্য কিছু ইমিউন সাপ্রেসিং ড্রাগস ব্যবহার করা হয়, যেমন- প্রতিস্থাপনকৃত হার্ট, কিডনি ও লিভার এর ক্ষেত্রে। সিডিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এইচআইভি/এইডস রোগী, অর্গান প্রতিস্থাপনের রোগী ও ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসায় ইমিউন সাপ্রেসিং ড্রাগস ব্যবহৃত হয়। এসব ড্রাগসকে অ্যান্টিরিজেকশন ড্রাগসও বলা হয়। উচ্চ ডোজে করটিকোস্টেরয়েড গ্রহণ করলেও ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়ে।’ লুপাস ও রিউম্যাটয়েড আর্থরাইটিসের মতো অটোইমিউন রোগের রোগীদেরও বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন, কারণ এসব সমস্যায় যেসব নতুন বায়োলজিক ড্রাগস ব্যবহার করা হয় তা অতিক্রিয়াশীল ইমিউন সিস্টেমকে দমিয়ে রাখে।

লিভার ও কিডনি রোগী: সিডিসির মতে, অন্যান্য ক্রনিক রোগের রোগীদেরও করোনাভাইরাস সংক্রমণ জনিত জটিলতার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে, যেমন- ক্রনিক কিডনি রোগ ও ক্রনিক লিভার রোগ। ডা. লং বলেন, ‘এসব রোগের কারণে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শরীরের যে সামর্থ্য রয়েছে তা কমে যায়। এছাড়া অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যাতেও ইমিউন সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

অন্যান্য: যেসব লোকের সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার মতো ব্লাড ডিসঅর্ডার রয়েছে এবং যারা রক্ত পাতলাকারী ওষুধ ব্যবহার করেন তাদেরও কোভিড-১৯ এর জটিলতায় ভোগার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে, সিডিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী। যুক্তরাষ্ট্রের দ্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন ড্রাগস অ্যাবিউজ সতর্ক করছে যে, যারা ড্রাগসের অপব্যবহার করেন তাদেরও করোনাভাইরাস সংক্রমণ জনিত জটিলতার বাড়তি ঝুঁকি রয়েছে। যারা ধূমপান করেন অথবা মারিজুয়ানা সেবন করেন অথবা ভেপ ব্যবহার করেন তাদের ফুসফুস ইতোমধ্যে ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে ওপিওইড ও মিথঅ্যাম্ফিটামিন শ্বাসতন্ত্রের ওপর চাপ ফেলে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here