ডেস্ক প্রতিবেদক: শরণার্থীরা সব দখল করে নিচ্ছে বলে ২০১৫ সালে ভয় পেয়েছিলেন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রবক্তারা৷ আর এখন করোনার সময়ে তারা মনে করছেন, রহস্যময় এক বিশ্ব শক্তির ক্ষমতা বাড়ছে৷

ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বর্তমানে সমাজের রন্ধ্রে পৌঁছে গেছে৷ এ বিষয়ে এখনও গবেষণামূলক তথ্য পাওয়া না গেলেও গত কয়েকদিনে আমি এর অনেক বাস্তব প্রমাণ পেয়েছি৷ ভাইরোলজিস্ট, বিল গেটস, টিকা, আঙ্গেলা ম্যার্কেল ও করোনা ঠেকাতে কড়াকড়ির বিরুদ্ধে বিভিন্ন মন্তব্য দিয়ে আমার ফেসবুকের টাইমলাইন ভরে গেছে৷

২০১৫ সালে ইউরোপে যখন শরণার্থী সংকট শুরু হয়েছিল তখন জার্মানিতে একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়েছিল৷ জার্মানদের পরিবর্তে আঙ্গেলা ম্যার্কেল গোপনে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়া থেকে লোকজন আনার পরিকল্পনা করছেন বলে দাবি করেছিলেন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রবক্তারা৷

হাঙ্গেরীয়-মার্কিন বিলিওনেয়ার ও জনসেবক জর্জ সরোসের জন্ম এক ইহুদি পরিবারে৷ বিশ্বব্যাপী ইহুদি ষড়যন্ত্রের সঙ্গে তিনি জড়িত এমন তত্ত্বও অতীতে ছড়িয়েছে৷

তবে এবার ষড়যন্ত্রের ধরনটা অন্যরকম৷ কিন্তু কেন? এর কারণ সম্ভবত করোনা এই বিশ্বের প্রায় সবাইকে ভোগাচ্ছে৷ বাচ্চারা কিন্ডারগার্টেন বা স্কুলে যেতে পারছেনা৷ মা-বাবাকে বাচ্চাদের দেখাশোনার পাশাপাশি আয়ের বিষয়টিও ঠিক রাখার চেষ্টা করতে হচ্ছে৷ বিশ্ববিদ্যালয়ও বন্ধ করে দিতে হয়েছে৷ অনেক ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানও কয়েক সপ্তাহের জন্য বন্ধ রাখতে হয়েছে৷

একটি ভাইরাস কি সমাজে এমন প্রভাব ফেলতে পারে? এটা কি সত্যি হতে পারে? এর উত্তরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেশিরভাগই মানুষই হয়ত বলবেন হ্যাঁ৷ কারও চোখে হয়ত তখন থাকবে অশ্রু৷ আর বাকি অল্প যারা আছেন, যারা কড়াকড়ির বিরুদ্ধে চিৎকার-চেঁচামেচি করছেন, তাদের বিশ্বাস ‘যারা ক্ষমতায় আছেন’ তারা আসলে শয়তানের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েছেন৷

২০১৫ সালে যারা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ছিলেন তারা তখন আসলে বাস্তব পরিস্থিতির সমালোচনা করেননি, তারা সমালোচনা করেছিলেন রাজনীতিবিদদের কৌশলের- যা প্রায় দশ লাখ শরণার্থী আসার সময় ব্যবহার করা হয়েছিল৷

বর্তমানে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রবক্তারা মৌলিক তথ্য নিয়ে প্রশ্ন করছেন৷ ভাইরাস ছড়ানো নিয়ে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যাকে বিতর্কিত করছেন৷ অবশ্য এই বিষয়েও একমত হতে পারছেন না তারা৷ কেউ মনে করছেন করোনা ইনফ্লুয়েঞ্জার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর না, কেউ ‘হার্ড ইমিউনিটি’কে সমর্থন করছেন৷ আর একটি অংশ আছে যারা টিকার কার্যকারিতায় বিশ্বাস করেন না৷

একটি সমাজ যখন কোনো একটি মৌলিক তথ্যে একমত হতে পারেনা, তখন কী ঘটে? এমন হতে পারে- কোনো তথ্যকে বিভিন্ন উপায়ে ব্যাখ্যা করার জন্য খোলামেলা বিতর্কের আর কোনো জায়গা বা প্রতিষ্ঠান থাকবেনা৷ এমন মনোভাব ইতিমধ্যে জার্মান সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে৷ কয়েকজন উচ্চপদস্থ ক্যাথলিক বিশপ সম্প্রতি একটি চিঠি লিখেছেন৷ তারা মনে করছেন, করোনা সংকট একটি ‘বিশ্ব সরকার’ তৈরির অজুহাত মাত্র৷ তাদের অভিযোগ, মহামারির কারণ দেখিয়ে ‘অযৌক্তিকভাবে’ মানুষের মৌলিক অধিকার চর্চা সীমিত করা হচ্ছে৷ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ করার ক্ষমতাকেও বেশি করে দেখানো হচ্ছে বলে মনে করেন তারা৷

অবশ্য এই বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি উপভোগ করছেন বিশ্বের একনায়কেরা, যারা সাম্প্রতিক সময়ে নিয়মিতভাবে বিশেষজ্ঞ ও অভিজাতদের কথায় সন্দেহ পোষণ করে এসেছেন৷ মহামারির সময়টি তারা তাদের সমর্থকদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে করছেন তারা৷ এই একনায়কেরা শিক্ষা বা জ্ঞানের পূজারি নন, তারা ভিত্তিহীন গুজব আর ক্ষমতার পূজারি৷ একসময় নির্বুদ্ধিতা ও কুসংস্কার গণতন্ত্রের কফিনে পেরেক ছুড়ে মারবে৷ করোনার সঙ্গে এই পরিণতির কোনো সংযোগ নেই, অনেকদিন ধরেই পপুলিস্টরা আমাদের সমাজকে বিষ দিয়ে কলুষিত করছে৷

আলেকজান্ডার গ্যোরলাখকার্নেগি কাউন্সিল ফর এথিকস ইন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সএর সিনিয়র ফেলো৷ এছাড়া তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়েররিলিজিয়ন অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ ইনস্টিটিউটএর সিনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েট৷

সূত্র ডয়চে ভেলে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here