চাঁদা না দেয়ায় জাল পুড়িয়ে দেয় তুহিন বাহিনী।

একে আজাদ
করোনা নয়, তুহিন বাহিনীর আতঙ্কে ‘লকডাউন’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার ডোমকান্দি হিন্দুপাড়ায়। ওই বাহিনীকে চাঁদা না দেয়ায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি তাদের। নারী-পুরুষ যে কেউ গ্রাম থেকে বের হলেই হামলার শিকার হচ্ছেন। শ্লীলতাহনী করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতির কারণে অনাহারে আর অর্ধাহারে গৃহবন্দি জীবনযাপন করতে হচ্ছেন ডোমকান্দি হিন্দুপাড়ার জেলেরা।
এ ঘটনায় তুহিন বাহিনীসহ তার সহযোগিদের বিরুদ্ধে সারিয়াকান্দি থানায় মামলা করা হয়েছে। তবে এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এতে করে আতঙ্ক রয়েছেন ডোমকান্দি হিন্দুপাড়ার বাসিন্দারা।
বগুড়ার নদী ভাঙ্গন অঞ্চল সারিয়াকান্দি। এখনকার বাঙ্গলী নদীর পাড়ে প্রায় ৬০টি হিন্দু পরিবার বসবাস করছে পূর্বপুরুষের আমল থেকেই। তাদের জীবিকার একমাত্র উৎস মৎস্য শিকার। মৎস্যজীবি সমবায় সমিতির মাধ্যমে তার দলবদ্ধ হয়ে বাঙ্গালী নদীতে মাছ ধরেন।

তুহিন বাহীনির হামলায় আহত

ওই গ্রামের জেলেরা অভিযোগ করেন, গত বৃহস্পতিবার রাতে তাদের কাছ থেকে মাছ ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে তুহিন বাহিনীর সন্ত্রাসীরা। এতে বাধা দিলে নদীর পাড়ে রাখা তাদের মাছ ধরার জাল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নদীতে মাছসহ রাখা জাল কেটে ফেলেন তারা। এ নিয়ে পরদিন থানায় মামলা করার জন্য বাড়ি থেকে বের হলেই তাদের উপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। এমন কী আহতদেরকেও চিকিৎসা নিতে বাধা দেওয়া হয়। পরে থানায় মামলা হয়। মামলার পর থেকে পুরো গ্রামই ‘লকডাউন’ করে দেয় তুহিন বাহিনী। এতে ব্যাপক শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন তারা।

তুহিন বাহিনীর হামলায় আহত আরেকজন।

গতকাল শনিবার সরেজমিনে ডোমকান্দি হিন্দুপাড়া গ্রাম ঘুরেও জেলে পরিবারের লোকদের মধ্যে আতঙ্কের ছাপ পাওয়া গেছে। ডোমকান্দি মৎস্য সমবায় সমিতির সভাপতি বুদ্ধিরাম বলেন, গত বুধবার রাতে পাশের এলাকার তুহিনসহ আরও সাত আটজন বলেন, তারা বাঙ্গালী নদীতে মাছ ধরতে চান। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্রামের ৫০-৬০ জনের একটি দল বাঙ্গালী নদীতে নিজেদের জাল দিয়ে ঘের দিয়েছেন। এত পরিশ্রম করে জাল টেনে সেখানে তো মাছ ধরতে দিলে আমাদের সব পরিশ্রম বৃথা হয়ে যাবে। সবাইকে না খেয়ে থাকতে হবে। তাই তাদের বলেছিলাম, আগে মাছ ধরি। তারপর আপনাদের মাছ দিব। কিন্তু ঘেরে মাছ ধরতে দেয়া যাবেনা। এরপর তার চলে যান। আর বলে যায় যায়, ‘তোদের বেশি করে মাছ খাওয়াব’। এর আধা ঘণ্টা পর তুহিনসহ আরো কয়েকজন বাড়ির পাশেই বাঙ্গলী নদীতে আমাদের ঘেরে হাজির হন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘এরপর আমি পাশেই বাঙ্গালী নদীতে যাই ঘেরে জাল পাহাড়া দিতে। সাথে আরও চারজন ছিলেন। কিছুক্ষণ পরই তুহিনসহ আরো কয়েক জন রাম-দা আর লাঠিসোঠা নিয়ে হাজির হন। প্রথমে আমাকে লাঠি দিয়ে কয়েকটি আঘাত করেন। এরপর রামদা গলায় ধরেন। আর বলেন চিল্লাপাল্লা করলে জান খতম করে দেয়া হবে। এই বলে মুহূর্তর মধ্যে নদীর পাড়ে রাখা সব জাল পুড়ে দেয়। পাশাপাশি নদীতে ফেলানো ঘেরের সব জাল কেটে রামদা দিয়ে তার সহযোগিরা কেটে ফেলেন। এরপর হুমকি দেয় যদি কাউকে বলিস, তাহলে আরও ক্ষতি হবে।’
ওই মৎস্যজীবি সমিতির সাধারণ সম্পাদক গজেন্দ্র নাথ বলেন, এই গ্রামে ৬০টিরও বেশি হিন্দু জেলে পরিবার বসবাস করেন। সকলে মিলে সমিতির মাধ্যমে জাল কিনেছেন তারা। এক সাথেই নদী থেকে মাছ ধরেন। মাছ বিক্রি করেই সংসার চলে। ওরা সেই জালগুলো নষ্ট করেছে। এতে জীবিকার একমাত্র পথ বন্ধ হয়ে গেছে। পরিদনি দুপুরে ঘটনাটি জানানোর জন্য নারী-পুরুষ মিলে ১০/১২ জন সারিয়াকান্দি থানার উদ্দেশ্যে রওনা হই। কিন্তু বাড়ি থেকে বেড় হওয়া মাত্রই আমাদের উপর অতির্কিত হামলা করেন তুহিন বাহিনী। এসময় চারজন আহত হন। আহতরা হলেন, ভিক্ষু চন্দ্র দাস (৪০), গগেন চন্দ্র দাস (৪৫), আধির দাস (৪৩) এবং মাতু রানি (৪৪)। আহতদের মধ্যে একজনের মাথা ফেটে যায়। আর বাকি সবার হাত-পা থেতলে দেয়। পরে আহতদের নিয়ে তাদের গৃহবধূরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বেড় হলে তাদেরও শ্লীলতাহানি ঘটায়।
কোন উপায় না পেয়ে ৯৯৯ এ কল করলে পুলিশ এসে উদ্ধার করে আহতদের হাসপাতালে ভর্তি করায়। পরে তুহিনসহ তার সহযোগিদের নামে থানায় মামলা করা হয়। মামলায় আসামি করা হয়েছে তুহিনসহ আরো ১৬জন সহযোগীর বিরুদ্ধে।
আহতদের মধ্যে গগেন চন্দ্র বলেন, দুই দিন হলো তার অ্যাপেন্টিসাইড অপারেশন করা হয়েছে। এমনিতেই হাটতে বসতে পারছিনা। এমনিতেই রাস্তায় দাড়িয়েছিলাম। এজন্য তুহিন আমার পা থেতলে দিয়েছে। তার উপর হামলার বিচার চান তিনি।
মামলার পর থেকে আরও খড়গ নেমে আসে ডোমকান্দি হিন্দু গ্রামে চারপাশে দিনরাত মহড়া দিচ্ছে তুহিন বাহিনী। কেউ বের হলেই হামলা করার জন্য এগিয়ে আসছে। এতে করে ভয় আর আতঙ্ক এখন গ্রামজুড়ে।
ববিতা রানী নামের আরেক গৃহবধূ বলেন, হিন্দু ধর্মের প্রত্যেক অনুষ্ঠানেই তুহিন বাহিনীকে চাঁদা দিতে হয়। কেউ যদি কোন এনজিও থেকে লোন নেয় তাহলেও তাকে চাঁদা দিতে হবে।
গৃহবধূ মোনেকা রানী বলেন, কয়েক মাস আগে একটা এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা লোন করেছিলাম। এখর পাওয়া মাত্র আমার থেকে জোর করে ১৫০০ টাকা নিয়ে যান তুহিন।
জয়ন্তী রানী বলেন, দেশের মানুষ করোনায় লকডাউন। আর আমরা তুহিন বাহিনীর ভয়ে লকডাউন হয়ে বন্দি দিন কাটাচ্ছি।
স্থানীয়রা আরো জানায়, তুহিনের বিরুদ্ধে এলাকার শতশত মানুষের অভিযোগ কিন্তু কেউ ভয়ে মুখ খুলেন না। নীরবেই চাঁদা দিয়ে যাচ্ছেন তাকে। সিগারেট বাকি না দেয়ায় ২০১৪ সালে রফিকুল ইসলাম নামের একজন মুদি দোকানি হত্যার অভিযোগ রয়েছে তুহিনের বিরুদ্ধে। ওই মামলায় তুহিন জামিনে আছেন। তুহিন একসময় ছাত্রদল করলেও এখন ক্ষমতাসীনদেও সাথে চলাফেরা করেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও তাকে সমীহ করে চলেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডোকান্দি গ্রামের বাসিন্দা তুহিন বলেন, মারামারি মামলা তার কাছে কোনো বিষয়ই নয়। দুদিনেই এই মামলা খেয়ে ফেলব। এর আগেও একটি হত্যা মামলা হয়েছিল। সেটায় জামিনে আছি। আগে ছাত্রদল করলেও এখন আওয়ামী লীগের মঞ্জিলের (সারিয়াকান্দি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মঞ্জিল সরকার) হয়ে কাজ করেন। সামনে উপনির্বাচন আছে। তিনি আমাকে দেখবেন।
এ বিষয়ে সারিয়াকান্দি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মঞ্জিল সরকার বলেন, তুহিন ছাত্রদল করেন। আমি জনপ্রতিনিধি, তাই সবাই আমার লোক। ওই লাকায় যদি কোন ঝামেলা হয়ে থাকে তা মিটিয়ে দেয়া হবে।
আপনার লোক তুহিন, আর আপনার হয়ে তিনি কাজ করেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে এড়িয়ে যান মঞ্জিল।
সারিয়াকান্দি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আল আমিন বলেন, জেলে পরিবারের উপর হামলার ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আতঙ্কিত হওয়ার কিছুই নেই। যদি কোন মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ্য হয়েও পুলিশকে না জানায়, তাহলে তো সেটা পুলিশের জানার কথা নয়। তবে তুহিনের নামের আগেও হত্যার অভিযোগ রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here