করোনা যুদ্ধে জয়ী শাহ আলম ও কিছু কথা

0
169
গনেশ দাস
সাধারন সম্পাদক
সাংবাদিক ইউনিয়ন,বগুড়া

২৯ মার্চ সকাল ৯ টা। বগুড়ার মহাস্থান থেকে সাংবাদিক ইউনিয়ন বগুড়ার সদস্য সেলিম উদ্দিনের ফোন। বলেন দাদা মহাসড়কের পার্শ্বে একজন ব্যক্তি পড়ে আছেন, শ্বাসকষ্টে তিনি কষ্ট পাচ্ছেন। অসংখ্য মানুষ দুর থেকে তাকে ঘিরে আছে,কিন্তু করোনা রোগী সন্দেহে কেউ কাছে ভিড়ছেন না।

মানুষটি বার বার পানি পান করতে চাচ্ছেন।এখন কি করা যায়? সেলিমকে পরামর্শ দেই নিরাপদ দুরুত্বে থেকে ওই ব্যক্তিকে সহযোগিতা করতে। এছাড়াও নাম ঠিকানা ও ছবি তুলে আমাকে পাঠাতে বলি। সেলিম তাকে এক বোতল পানি,পাউরুটি এবং ওই ব্যক্তির বলা মতে শ্বাস কষ্টের ওষুধ সরবরাহ করেন। ইতিমধ্যে আমি যোগাযোগ শুরু করি লোকটিকে রাস্তা থেকে হাসপাতালে নেয়ার জন্য।

শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার উদ্যোগে পাঠানো এ্যাম্বুলেন্স পৌছার আগেই শিবগঞ্জ থানার এসআই মোহাম্মদ আলীসহ অন্যান্য পুলিশ সদস্যরা একটি ভ্যানে তুলে তাকে নিয়ে যায় শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।
সেলিম ওই ব্যক্তির ছবি আমাকে দিতে বগুড়া শহরে আসে এবং জানায় শাহ আলম নামের ওই ব্যক্তির বাড়ি রংপুর সদরের ধাপের হাট গ্রামে।ঢাকা থেকে খালি ট্রাকে অল্প ভাড়ায় তিনি বাড়ি ফিরছিলেন।

পথে শ্বাসকষ্ট শুরু হলে করোনা রোগী সন্দেহে ট্রাকের ড্রাইভার -হেলপার ভোর রাতে তাকে রাস্তায় ফেলে রেখে যায়। শিবগঞ্জ হাসপাতালে শাহ আলমকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। শাহ আলম চিকিৎসককে জানান তিনি অ্যাজমা ও হার্টের রোগী। সেই অনুযায়ী হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্স যোগে শাহ আলমকে পাঠিয়ে দেয়া হয় বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে শাহ আলমকে হার্ট ইউনিটের সিসিইউতে ভর্তি করানো হয়।

শাহ আলমের কাছে মোবাইল ফোন না থাকায় তার পরিবারের সদস্যদের খুজে বের করতে স্মরনাপন্ন হই রংপুরের সাংবাদিক ফরহাদুজ্জামান ফারুকের। শাহ আলমের ছবি এবং ঠিকানা পাঠিয়ে দেই। ফরহাদুজ্জামান ফারুক শাহ আলমের ছবি এবং আমার মোবাইল নাম্বার দিয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন।

দুপুরের পর রংপুরের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নারী নেত্রী আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, তারা শাহ আলমের স্বজনদের খুজে বের করার চেষ্টা করছেন। হাসপাতালের কোন ইউনিটে এবং কত নম্বর বেডে শাহ আলম চিকিৎসাধীন আছেন সে বিষয়ে আমাকে হাসপাতালে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করেন। শহীদ জিয়া হাসপাতালে খোজ নিতে গেলে আমাকে জানানো হয় রংপুরের কোন রোগী সেখানে ভর্তি হয়নি।

২৯ মার্চ সারাদিনে একজন রোগী ভর্তি হয়েছেন বগুড়ার দুপঁচাচিয়া থানার ধাপের হাট গ্রামের। হাসপাতাল থেকে এ তথ্য দেয়ার পর চিন্তায় পড়ে যাই,রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে আসা রোগী গেল কোথায়? তাহলে কি করোনা সন্দেহে হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে?আমি যোগাযোগ করি শিবগঞ্জের ইউএনও এবং শিবগঞ্জ হাসপাতালের আরএমও সর্বশেষ এ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভারের সাথে। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী রোগী শহীদ জিয়াতেই ভর্তি আছে।

এরপর আবারো যোগাযোগ করি শহীদ জিয়া হাসপাতালে।রোগীর নাম এবং বয়স মিলিয়ে নিশ্চিত হই রংপুরের ধাপের হাটের শাহ আলমের ঠিকানা লিখতে ভুল করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তার স্বজনেরা বগুড়ায় চলে আসেন এবং রোগীকে দেখা শোনা শুরু করেন। এদিকে শাহ আলমের নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হয় এবং কয়েকদিন পর নিশ্চিত হওয়া যায় তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত।

এরপর শাহ আলমকে পাঠানো হয় বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে।অন্যদিকে শাহ আলমকে বহনকারী ,এ্যাম্বুলেন্স চালক,চিকিৎসক,নার্স,পুলিশসহ ২৪ জনকে পাঠানো হয় সঙ্গরোধে। সেই সাথে শাহ আলমকে বহনকারী ভ্যান চালকে খুজে বের করতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। অনেক চেষ্টার পর পুলিশ খুজে বের করে ভ্যান চালককে।

সঙ্গরোধ থেকে বাদ যাননি প্রথম সংবাদ দাতা সেলিম উদ্দিন।শাহ আলমের স্ত্রী তার স্বামীর সাথে অবস্থান করলেও জামাই চলে যান রংপুরে।সেই সংবাদে রংপুরে তার বাড়ীও করা হয় লক ডাউন। শাহ আলম বগুড়ায় প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হওয়ায় কিছুটা হলেও করোনা আতংক ছড়িয়ে পড়ে। শাহ আলম চিকিৎসাধীন অবস্থায় দিনে দিনে সুস্থ হতে থাকে।কিন্তু শাহ আলমের স্ত্রী স্বামীর সেবায় নিয়োজিত থাকলেও তার মধ্যে করোনা উপসর্গ দেখা দেয় নি। চিকিৎসাধীন শাহ আলম ও তার স্ত্রীর নমুনা পর পর দুই পাঠানো হলে তাদের রিপোর্ট করোনা নেগেটিভ হওয়ায় চিকিৎসক বলছেন শাহ আলম সুস্থ হওয়ার পথে। এদিকে সঙ্গরোধে থাকা

পুলিশ, সাংবাদিক, চিকিৎসক,নার্স, ভ্যানচালক, এ্যাম্বুলেন্স চালকসহ প্রত্যেকের দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেছে।তাদের কারো মধ্যে এইসময় করোনা উপসর্গ দেখা দেয় নি।

সর্বশেষ গত ১৫ এপ্রিল শাহ আলম ও তার স্ত্রীর আবারো নমুনা পাঠানো হয়েছে।এবারও নেগেটিভ আসলে করোনা যুদ্ধে জয়ী শাহ আলমকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হবে।
(বিঃদ্রঃ-শাহ আলমকে রাস্তা থেকে হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে যারা সহযোগীতা করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন ইউএনও শিবগঞ্জ, আলমগীর কবীর,শিবগঞ্জ থানার ওসি মিজানুর রহমান,মোহাম্মদ আলী হাসপাতালের আরএমও ডাঃ শফিক আমিন কাজল,জেলা বিশেষ শাখার পুলিশ পরিদর্শক আশিক ইকবাল,বগুড়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক জে এম রউফ এবং ডিবিসি নিউজের বগুড়া প্রতিনিধি রাকিব জুয়েলসহ নাম না জানা আরো অনেকে। প্রত্যেকের প্রতি রইল কৃতজ্ঞতা।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here