কৃষি জমির মাটি ইটভাটায়, প্রশাসনের কিছুই করার নেই!

0
313
রাত ৮টার দিকে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার আড়িয়া ইউনিয়নের বামুনিয়া এলাকা থেকে ছবিটি তোলা-দৃষ্টি২৪
স্টাফ রিপোর্টার:
রাত হলেই আইন ঘুমিয়ে পড়ছে! ফলে ধংশযজ্ঞ চলছে বগুড়ার শাজাহানপুরের কৃষি জমি। প্রতি রাতে শতশত ট্রাক মাটি চলে যাচ্ছে ইটভাটায়। নষ্ট হচ্ছে গ্রামীন সড়ক, ট্রাকের বিকট শব্দ ঘুম হারাম করে দিয়েছে এলাকবাসির। গত প্রায় মাস খানেক যাবত মাটি সন্ত্রাসীদের এমন তান্ডব থামছেই না। এদিকে ইউএনও, এসিল্যান্ড আর ওসির করার কিছুই থাকছেনা।
অথচ কৃষি জমি সুরক্ষা ও ব্যবহার আইন (২০১৬) এর খসড়ায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের যে সকল কৃষি জমি রহিয়াছে, তাহা এই আইনের মাধ্যমে সুরক্ষা করিতে হইবে এবং কোনোভাবেই তাহার ব্যবহার ভিত্তিক শ্রেণি পরিবর্তন করা যাইবে না।’
এই আইন অমান্য করলে (কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান) ‘তিনি বা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী ব্যক্তিবর্গ কিংবা তাহার বা তাহাদের সহায়তা প্রদানকারী কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাগণ সর্বোচ্চ ০৩ (তিন) বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বনিম্ন ০৩ (তিন) লক্ষ টাকা পর্র্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং বর্ণিত কৃষি জমি সরকার কর্তৃক বায়েজাপ্ত করা হইবে।’
এছাড়াও ইট প্রস্তুত এবং ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রন) আইন- ২০১৩ তে-ও বলা হয়েছে, ইটভাটায় ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি ব্যববহার করলে প্রথম বারের মতো দুই বছরের কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা। আইন থাকার পরও তা বাস্তবায়ন হচ্ছেনা শাজাহানপুর উপজেলায়।

এবিষয়ে শাজাহানপুরের উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা পারভীনকে মুঠোফেনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে শাজাহানপুরে মাটি কাটা চলছে স্বীকার করে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিম উদ্দিন বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে চেষ্টা চলছে। তারপরও পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছেনা মাটি কাটা। তবে দুই একদিনের মধ্যে ফসলি জমি থেকে শতভাগ মাটি কাটা বন্ধ নিশ্চিত করা হবে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার চোপীনগর ইউনিয়নের কচুয়াদহ রঙ্গীলা ব্রীজের পাশ থেকে রাতের আধাঁরে এসকেভেটর লাগিয়ে পাশাপাশি দু’টি মাটির পয়েন্ট থেকে দেদারছে বিটমাটি কাটা হচ্ছে। সন্ধারাতের পর থেকে সকাল ৭-৮টা পর্যন্ত চলা ২০-৩০টি ড্রামট্রাকের বেপরোয়া যাতায়াতের শব্দ আর বিকট শব্দে হাইড্রোলিগ হর্ণের কারণে নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে রাস্তার পাশে বসতবাড়িতে ঘুমিয়ে থাকা আবাল বৃদ্ধ বনিতার।

শাহ আলম নামের এক গণমাধ্যমকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, উপজেলার দুরুলিয়া গ্রামে দুবলাগাড়ী-কচুয়াদহ সড়কের পাশে তার বাড়ি। গত তিন দিন ধরে সন্ধার পর থেকে সকাল ৭-৮ টা পর্যন্ত দুবলাগাড়ী-কচুয়াদহ সড়কে ২০-৩০টি ড্রামট্রাক মাটি বোঝাই করে বেপরোয়া ভাবে যাতায়াত করে। এই ট্রাকগুলির চালক অধিকাংশই অপ্রাপ্ত বয়স্ক হেলপার। নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স। হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে ঘুমন্ত মানুষের গায়ে ট্রাক উঠে যাওয়ার শংকা আর বিকট শব্দে ছোট ছোট শিশু সন্তানসহ বৃদ্ধ মানুষকেও নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে। গণমাধ্যকর্মী হওয়ায় সাধারন মানুষের ধারনা সাংবাদিক চাইলেই এই দূর্ভোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ইউএনও, এসিল্যান্ড ও ওসি সহ সংশ্লীষ্ট প্রশাসনকে জানিয়েও তিনি কোন সুরাহা পাননি। দেশের একজন নাগরিক হিসেবে সাধারন মানুুষদের এই দূর্ভোগ-দূর্দশার হাত থেকে রক্ষা পেতে সংশীষ্ট প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।
এছাড়াও উপজেলার আমরুল ইউনিয়নের নারচি সোনার পাড়া, মাঝিড়া ইউনিয়নের বাটেপাড়া, চকজোড়া, খোট্টাপাড়া ইউনিয়নের খলিশাকান্দি, আড়িয়া ইউনিয়নের সোনাইদিঘী, আশেকপুর ইউনিয়নের পারতেকুর এবং খরনা ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রাম থেকে একই ভাবে মাটি কাটা হচ্ছে। এছাড়া দুই একটি পয়েন্ট কৌশলগত কারণে দুই এক দিন বন্ধ রেখে পুনরায় চালু করছে।

 

আড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম মন্টু জানান, আমরুল ইউনিয়নের নারচি সোনারপাড়া মাটির পয়েন্ট থেকে প্রতিরাতে বেশ কয়েকটি মাটিবোঝাই ট্রাক আড়িয়া বাজার-ডেমাজানী সড়ক দিয়ে যাতায়াত করে। কয়েকদিন আগে আড়িয়া বাজার এলাকায় ট্রাক থামিয়ে নিষেধ করার পরও তারা মানেনি।
উপজেলার ওমর ফারুক নামে এক গণমাধ্যকর্মী জানান, উপজেলা সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড) আশিক খান গত মৌসুমে বেশ কয়েকটি মাটির পয়েন্টে রাতের আধাঁরে অভিযান চালিয়েছেন। সেসময় বালি, মাটি ব্যবসায়ীরা আতংকে ছিলেন। সম্প্রতি এসিল্যান্ড আশিক খান করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি চিকিৎসাধিন থাকা অবস্থায় বাহিরে বের না হওয়ার সুযোগকেই কাজে লাগিয়েছেন এই সমস্ত বালি, মাটি ব্যবসায়ীরা। দিনের বেলা মাটির পয়েন্ট থেকে এসকেভটর তুলে অন্যেত্র লুকিয়ে রেখে সন্ধার পর আবারো নিয়ে এসে দস্যুতা শুরু করে। সাধারন মানুষের চরম ভোগান্তি আর পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত গ্রামীণ রাস্তা-ঘাট ক্ষতি গ্রস্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে সংশ্লীষ্ট প্রশাসনকে অনুরোধ জানান তিনি।
বগুড়া জেলা প্রশাসক জিয়াউল হক জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছুটিতে আছেন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here