গরুর রেখে যাওয়া ক্লু ধরে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় চোরের বাড়িতে ‘মালিক’

1
416

 

লেখক: আলী আশরাফ ভুঁইয়া (বিপিএম) পুলিশ সুপার,বগুড়া।

রাতে সাড়ে এগারোটা।গরু দুটির মশারি টাঙিয়ে দিল রফিক মিয়া। বিছানায় শুয়ে চোখ দুটি বন্ধ করল।এমনি মনে পরলো গোয়াল ঘরের দরজাটির কথা।দরজাটি টেনে দিয়ে এসেছে তো
ঠিক মতো? ছনের গোয়ালঘর ।ছনের বেড়া । বাঁশের তৈরি দরজা।দরজা থাকা আর না থাকা সমান। অস্ট্রেলিয়ান গরু দুটির মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠলো। মনটা আনন্দে ভরে গেল।সামনের কোরবানির ঈদের বাজারে বেশ দাম পাওয়া যাবে।অনেক টাকা লাভ হবে।লাভের টাকার কিছু অংশ দিয়ে সবার আগে গোয়াল ঘরের বেড়া এবং দরজাটা মেরামত করবে। বাকি লাভের অংশ দিয়ে সংসারটা টেনে নেবে। মূল টাকা দিয়ে আবার গরু কিনবেন। ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে গেল।

রাত তিনটের সময় কেন জানি ঘুমটা ভেঙে গেল রফিক মিয়ার। ভাবলো গোয়ালঘর টা চেক করে আসি। বসত ঘরের দরজা খুলে ওখানে দাঁড়িয়েই গোয়াল ঘরের দরজায় সরাসরি টর্চ মারল। দরজাটা দেখেই বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠল। গোয়াল ঘরের দরজা খোলা। রফিক মিয়া দিলেন দৌড়। গোয়াল ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলেন। টর্চের আলো ফেলে দেখল গরু দুইটি নেই। গোয়াল ঘর ফাঁকা।বুকের ভেতরের চাপা কান্নায় গুমড়ে কেঁদে উঠলো।গোয়াল ঘর থেকে বাইরে বের হয়ে আসলো। মুখ দিয়ে কথা বের করতে পারছেন না। শরীরের সকল শক্তি গলায় একত্রিত করে ডাকদিল, হজরত, জুলমত, ফারুক তোরা কই। আমার গরু দুটি চোরে নিয়ে গেছে রে!
ঘর থেকে বের হয়ে আসলো ওরা। চারদিকে কোথাও গরুর কোন চিহ্ন নেই। বাড়ির আশপাশে ক্ষেত, পিছনের জঙ্গল, সবকিছু খুঁজে দেখলো কোথাও নেই।রাত সোয়া তিনটা। এত গভীর রাতে কোথায় খুঁজে পাবে?

বাড়ির খানিক দূরেই একটি রাস্তা । খুঁজতে খুঁজতে তিনজনই রাস্তায় গিয়ে উঠলেন। কিছুদূর হেঁটে টর্চের আলো ফেলতেই দেখল গরুর পায়ের ছাপ।রফিক চিৎকার দিয়ে উঠল। গরুর পায়ের ছাপ এটা আমার গরুর পায়ের ছাপ, এটা আমার গরুর পায়েরই ছাপ। রাস্তা ধরে ওরা হাঁটতে থাকল হাঁটতে থাকল এবং হাঁটতে থাকল।অনেক দূর যাওয়ার পর দেখল রাস্তা শুকনা । কোন পায়ের ছাপ নেই।শুকনা টনটনে রাস্তা। সেখানে কিভাবে পায়ের ছাপ থাকবে।রফিক মিয়ার বুকটা ধক ধক করছে। কিন্তু সে আশা ছাড়েনি।হাঁটতে থাকলো । শুকনা রাস্তা পার হয়ে আবারো পেল ভেজা রাস্তা।আবারো পাওয়া গেল গরুর পায়ের ছাপ। হাঁটতে-হাঁটতে ভোর ছয়টা বাজলো হাঁটা শুরু করেছিল সোয়া তিনটায়।কখন শেষ হবে হাঁটা ?কোথায় গিয়ে শেষ হবে? হাঁটতে হাঁটতে যদি পাকা রাস্তায় গিয়ে পড়ে? তাহলে তো কোন চিহ্ন পাওয়া যাবে না । ভাবছেন রফিক মিয়া। ভাবছে সন্ধ্যার পরে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হওয়াতে বেশ ভালই হয়েছে। না হলে এতোটুকু ও খোঁজ পেত না।সময় তখন ভোর সাড়ে ৬টা, কতটুকু রাস্তা হেঁটেছে কিছুই বলতে পারবেন না। ঘোরের মাঝে হেটেছে । কেবল এতটুকু মনে আছে রাত সোয়া তিনটায় হাঁটা শুরু করেছিল। গরুর পায়ের ছাপ তাদেরকে নিয়ে গেল বগুড়ার শেরপুর থেকে বক্কার মোল্লা কসাই,মোস্তফা মোল্লা কসাই,শাহীন মোল্লা কসাই,সাং-পারকোদলা, রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ এর বাড়ি। হটাৎ ছোট গরুটি একটা ঘর থেকে বের হয়ে আসলো । রফিক মিয়া চিনতে পারলো। গরুটি জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে দিল। এবার খুঁজতে থাকলো গাভীটি। কোথাও নেই। একটু দুর দেখলো কিছু মাটি দিয়ে কি জানি ঢেকে রাখা আছে। রফিক মিয়া মাটি গুলি সরালো। দেখলো ওখানে কেবল তাজা রক্ত। দৌড় দিয়ে কসাইয়ের ঘরে ঢুকে ফ্রিজ খুলল। যা দেখলো রফিক মিয়ার শরীরটা হীম শিতল হয়ে গেল।

গরুর মাথাটা পরে আছে। চোখ দুটো নিথর তাকিয়ে আছে রফিক মিয়ার দিকে……..

1 COMMENT

  1. কসাইয়ের সম্পত্তি বিক্রি করে রফিক মিয়াকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে দেওয়া উচিৎ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here