চলনবিল; ফলনে খুশি হলেও চিকন ধানের ন্যায্য মুল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক

0
362

আশরাফুল ইসলাম সুমন, সিংড়া:

নাটোরের সিংড়া উপজেলার কৃষি প্রধান চলনবিল অঞ্চলে চলতি মৌসুমের ইরি-বোরো ধান কাটা প্রায় শেষ হয়েছে। এবার বোরো ধানের ফলন ও দাম দুটোতেই খুশি হয়েছেন কৃষকরা। গতবছর যে সব জমিতে মিনিকেট জাতের বোরো ধানের ফলন হয়েছিল ২০ থেকে ২২মণ সেই সব জমিতে এবার উৎপাদন হয়েছে ২৫ থেকে ২৭ মণ।

প্রতি বিঘায় ৫ থেকে ৬ মণ ধান বেশী উৎপাদন হয়েছে। সেই সাথে গতবারের তুলনায় ধানের দামও বেশি পাচ্ছেন কৃষক।

গত বছর ধান কাটা পর পরই মিনিকেট ধানের দাম ছিল প্রতিমণ ৬০০ টাকা থেকে ৬৫০ টাকা। এবছর সেই মিনিকেট ধান কৃষকরা জমি থেকেই ফড়িয়াদের কাছে বিক্রয় করছেন প্রতি মণ ৮৫০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা দামে।

গতকয়েক বছরে ধানের দাম না থাকায় প্রতিবারই লোকসান গুনতে হয়েছে কৃষকদের। এবার লোকসান কাটিয়ে উঠবে বলে কৃষকরা জানিয়েছেন।

তবে ধানের দাম নিয়ে এখনও সন্তেষ্ট নয় চিকন চাউলের মিনিকেট ধান চাষের কৃষকরা। তাঁদের দাবি তাঁরা এখনও সরকারী ন্যায্য মুল্যে ধান বিক্রয় করতে পারছেন না।
সরকারী মোটা ধানের মুল্য ২৬ টাকা কেজি দরে প্রতি মণ ১০৪০ টাকা র্নিধারন করা হলেও ফড়িঁয়াদের কাছে তাঁরা চিকন চাউলের মিনিকেট ধানই প্রতি মণ ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকা টাকা কমে বিক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ, মোটা ধানের চেয়ে মিনিকেট ধান-চাউলের চাহিদা ও দাম সবসময়ই বেশি। সরকারী সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় প্রতিবারই কোন না কোন ভাবে ঠকছেন কৃষক। এমন অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।
উপজেলার শেরকোল, চৌগ্রাম, ইটালী, ডাহিয়া ও শুকাশ ইউনিয়নের কয়েকজন প্রান্তীক কৃষকের সাথে কথা বলে এমন তিক্ত অভিযোগ ও তথ্য জানা গেছে।

ইটালী ইউনিয়নের সাতপুকুরিয়া গ্রামের কৃষক রজব আলী বলেন, আমার ৫ বিঘা জমির মিনিকেট ধান কেটে ফলন পেয়েছি ১৩০ মণ। গতবার এই ৫ বিঘা জমিতে পেয়েছিলাম ১০৫ মণ।

সব মিলে এবার ফলন বেশি পেয়েছি ২৫ মণ। প্রতি মণ ৮৫০ টাকা দরে ৫০ মণ ধান বিক্রয় করে দেনা পাওনা শোধ করেছি। ডাহিয়া ইউনিয়নের আয়েশ গ্রামের কৃষক আলতাফ হোসেন বলেন,গত কয়েক বছর ধরেই ধান চাষে লোকসান গুনতে হয়েছে। এবার ফলন বেশি পাওয়ায় ভেবেছিলাম সেই লোকসান কাটিয়ে উঠবো। কিন্তু ধানের দাম সরকারী মুল্য পাচ্ছিনা।

এছাড়া আমাদের এলাকায় বেশির ভাগই মিনিকেট ধানের চাষ হয়েছে কিন্তুু সরকারী ভাবে নেওয়া হচ্ছে মোটা ধান। চিকন চাউলের মিনিকেট ধানের তুলনামুলক দাম পাচ্ছি কম, তাই আমরা এবছরও ঠকছি। শেরকোল ইউনিয়নের তেলীগ্রামের কৃষক আব্দুল রাজ্জাক মন্ডল বলেন, মিনিকেটের পাশাপাশি আমি মোটা ধানেরও চাষ করেছি। কিন্তু সরকারী মুল্যে ধান বিক্রয়ের আশা করা যায়না। সরকারতো আর আমাদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনেননা। অনেক পরে কিনেন তাও আবার লটারী করে। কারও ভাগ্যে জোটে কারও ভাগ্যে জোটেনা। ধান কাটা পরই দেনা পাওনা শোধ করা লাগে।

জমি লিজের টাকা দেওয়া লাগে। তাই বাধ্য হয়েই ফড়িয়াদের কাছে সব ধান বিক্রয় করে দিয়েছি।
সিংড়া উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ সাজ্জাদ হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪ হাজার ৫ শত হেক্টর জমি। এতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরে হয়েছিল ২ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন ধান। লক্ষ্য মাত্রা ছাড়িয়ে এবার চাষ হয়েছে,৩৬ হাজার ৬ শত ৫০ হেক্টর জমিতে। একদিকে চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে অন্য দিকে গতবারের চেয়ে ফলনও বেশি হয়েছে । তাই চলতি মৌসুমে বোরো ধানের উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা অনেকটাই ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

এবছর এই উপজেলায় মোট ধান চাষের ৮৫% মিনিকেট ধান, বাকি ১৫% মোটা ধানের চাষ হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছাঃ নাসরিন বানু জানান, গত মঙ্গলবার বোরো ধান ও চাল সংগ্রহ উদ্বোধন করা হয়েছে। এবার বিএসদের মাধ্যমে কৃষকদের তালিকা সংগ্রহ করে লটারীর মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করা হবে। স্ব স্ব ইউনিয়ন পরিষদ, সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে কৃষকদের এই তালিকা ঝুলিয়ে দেয়া হবে। তালিকা অনুযায়ী নির্ধারিত সরকারী মুল্যে ধান ও চাল সংগ্রহ করা হবে।

এবছর ৭ হাজার ২ শত ৪৭ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা হবে বলে জানান তিনি। এছাড়া মিলের মালিকদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করা হবে সিদ্ধ চাল ৩৯১০ মেট্রিক টন, আতব চাল ২৯৭ মেট্রিক টন। তিনি আরও জানান, নির্ধারিত সরকারী মুল্যে মোটা ধান ২৬ টাকা কেজি, আতব চাল ৩৫ টাকা এবং সিদ্ধ চাল ৩৬ টাকা কেজি দরে নেয়া হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here