একে আজাদ
মুক্তিযুদ্ধকালিন সময়ে নিজের বীরতে¦র কথা আড়ালেই রেখে গেলেন মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত মেজর আব্দুল খালেক। তার বুদ্ধিমত্তায় ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরেই প্রান হাড়ানো থেকে রক্ষায় পায় রংপুর সেনানিবাসের অধীনে সৈয়দপুরের তৃতীয় ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সকল সেনাসদস্যগন। মৃত্যুর পর নিজ হাতে লেখা ডায়েরিতে থেকে এমন তথ্যই মিলেছে। হয়োতো তিনি চাননি, নিজের প্রশংসিত কাজের বাহবা নিতে। দেশ রক্ষার দায়িত্ববোধ থেকেই স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন নিয়েই বঙ্গবন্ধুর ডাকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। নিজের ড্রয়ারের এক কোনা রাখা ছিল ওই ডায়েরিটি। তার মৃত্যুপর ওই ডায়েরিটির সন্ধান পায় পরিবারের সদস্যরা।

১৯৩৭ সালের ২১ মার্চ বৃহত্তর বরিশাল জেলার তৎকালীন ভোলা সাব ডিভিশন এর দৌলত খাঁ এর পুরাতন হাজ্বীপুর গ্রামের মৌলভী হাবিবুর রহমান বকসী ও মাতা মরহুমা আয়মনা খাতুনের ঘরে জন্ম নেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মেজর আব্দুল খালেক।
তার বাবা ছিলেন ছিলেন তৎকালীন মক্তব এর মৌলভী। মাতা ছিলেন গৃহিনী। পরিবারে ৫ ভাই বোনের ভিতর তিনি ছিলেন কনিষ্ঠ। শৈশবকাল থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। তিনি ৯ম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে একই শ্রেণীর অনেককেই পড়াতেন । তিনি যখন চতূর্থ শ্রেণীর ছাত্র তখন পিতাকে হারান, নবম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে মাতাকে হারিয়ে মাতৃস্নেহ হতে বঞ্চিত হন। পিতা মাতার অবর্তমানে ভাইদের সংসারে তিনি বড় হন তিনি।

মরহুম বীর এই মুক্তিযোদ্ধা মেজর আব্দুল খালেক ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার প্রাধিকার পাবার জন্য বাঙ্গালী যখন আন্দোলন করছে তখন তিনি সেই অভিপ্রায় তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন ইষ্ট বেঙ্গল রেজি: এর প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মেজর আব্দুল গণির হাতে।
১৯৫৫ সালে একই জেলার নিবাসী মরহুম মাওলানা শহীদুল ইসলাম ও মরহুমা আমেনা খাতুনের কণ্যা মিসেস সুফিয়া খাতুনকে বিবাহ করেন। তাদের পরিবারে ২ কণ্যা ও ২ পুত্র সন্তান রয়েছে।

মেজর খালেকের সহধর্মিনি মিসেস সুফিয়া খাতুন। ছবিটি আশির দশকে তোলা।

১৯৮৯ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৭ বৎসর বর্ণাঢ্য সামরিক কর্ম জীবনে অতিবাহিত করেন। ২০০২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান। বগুড়া সেনানিবাসে অবস্থিত সেনা কবরস্থানে ২১ বাংলাদেশ ইনফেন্ট্রী রেজিমেন্ট ও বগুড়া সদর উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক পূর্ন সামরিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

কিন্তু চাকুরীর সুবাদে তিনি মৃত্যুও আগ পর্যন্ত বগুড়ার মাঝিড়া ক্যান্টনমেন্ট সেনা স্মরনি সংলগ্ন রহিমাবাদ এলাকায় স্বপরিবারে বসবাস করতেন।

সেনাবাহিনীতে চাকুরিকালিন সময় বঙ্গবন্ধুর ডাকে তিনি দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেন মেজর আব্দুল খালেক । এজন্য রাষ্ট্রীয় সম্মামনাও পেয়েছেন অনেকবার। স্বাধীনতা উত্তর সময়ে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার ২ বৎসর এ জোষ্ঠ্যতা প্রদান সহ মেজর আব্দুল খালেককে রন তারকা, সময় পদক, মুক্তি তারকা, সংবিধান পদক, নিরাপত্তা পদক-১, নিরাপত্তা পদক-২, পেশাগত দক্ষতা এবং জোষ্ঠ্যতার কারনে তিনি জোষ্ঠ্যতা পদক-১,২ এবং ৩ পদকে ভূষিত হয়েছিলেন।
এতসব রাষ্ট্রীয় পুরস্কার আর সম্মামনার পেছনে যেসব বীরগাঁথা গল্প ছিল। তালা তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আড়ালেই রেখে গিয়েছিলেন। তার ছেলে তপন বক্সি’র সাথে কথা বলে এসব তথ্য বেড়িয়ে এসেছে। বীর এই যোদ্ধার নিজ হাতে লেখা ডায়েরি কিছু অংশ তুলে ধরা হলো-
১৯৭১ সালে ২৫ মার্চের কাল রাতের পর ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ডাক আসে। আমি তখন সেই ডাকে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে অংশ নেই। তখন আমি তৃতীয় ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের চলমান সদস্য। রংপুর সেনানিবাস এর অধীনে সৈয়দপুর সেনা ইউনিটে অবস্থান করেছিলাম। তখন আমার সাথে সহযোদ্ধা হিসেবে ছিলেন ক্যাপ্টেন মো. আনোয়ার হোসেন (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল ও প্রয়াত) ও ক্যাপ্টেন মো. আশরাফ হোসেন হিরু (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল ও প্রয়াত)।
যুদ্ধ কালীন সময় তৃতীয় ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অভ্যন্তরে গুপ্তচর বৃত্তির উদ্দেশ্যে অনুপ্রবেশকারি দুই জন ছদ্দবেশি ব্যাক্তিকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছিলাম। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে প্রতিয়মান হয় যে, তারা দুই জনই অবৈধ অনুপ্রবেশ কারী ও পাকিস্থানি গুপ্তচর। একজন ছিলেন পাক সেনাবাহিনীর ক্যাভালরি কোরের সদস্য নাম মেজর কোরেশি অপরজন বাঙ্গালী পাকিস্তান পুলিশ বাহিনীর অবসর প্রাপ্ত পুলিশ সুপার (এস পি)। উভয় যখন গোয়েন্দা বৃত্তির জন্য ইউনিট অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তখন কর্তব্যরত সৈনিকরা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ কালে সন্দেহ হলে তারা আমার সরনাপন্ন হন। আমি প্রথমে মেজর কোরেশি কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে জানায় সে একজন ড্রাইভার তার মালিক পার্শ্বের ব্যাক্তি। একথা শুনে তাদের প্রতি আমার সন্দেহের মাত্র বেড়ে যায়। তাদের মধ্যে ড্রাইভার পরিচয়দানকারিকে কোথায় যেন দেখেছি এমনটাও মনে হচ্ছে। তবে কোথায় দেখেছি তা মনে করতে পারছিলাম না। তার কথাবার্তার অসংগতি দেখে কিছুক্ষনপর মনে পড়ে যায়। ১৯৭০ সালে লেফটেনেন্ট কর্ণেল এইচ এম এরশাদ (পরবর্তিতে সেনা প্রধান ও রাষ্ট্রপতি) তৃতীয় ইষ্ট বেংগল এর অধিনায়ক থাকাকালিন সময়ে তৃতীয় ইবিআর হতে ৭ম ইবিআর (পশ্চিম পাকিস্তান) এ বদলি হন তখন তার বিদায় পাটিতে কথিত ড্রাইভার পরিচয়দানকারিকে দেখেছিলাম। সে আর কেউ নয় তিনি হলেন পাকিস্থানি অর্মি মেজর কোরেশি।

তথন তাকে জিজ্ঞেস করলাম Are you not Major Major Course from Cavalry? তখন কথিত ড্রাইভার স্থম্ভিত হয়ে যায় এবং লাল বর্ণ মুখ নীল বর্ন ধারন করে ফলে তাকে আটক করা হয়। সাবেক এসপি পালিয়ে যায় পড়ে মেজর কোরেশিকে পরিখার এর ভিতর হত্যা করা হয়।
এরপর ৩০ এপ্রিল ১৯৭১ পর্যন্ত বাংলাদেশ অভ্যন্তরে একাধিক সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেই। প্রতিটি যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে যে বেঁচে ফিরবো। এমন সম্ভাবনা কোন বারই ছিলনা।
পাকিস্থানি আর্মি’র মেজর কোরশিকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে মাড়িয়া হয়ে উঠে পাক-বাহীনি। কিছু দিনের মধ্যেই পাকবাহীনির বোম্বিং এর কারণে ইষ্ট বেংগল ইউনিটটি ছত্র ভঙ্গ হয়ে যায়। অস্ত্র-গুলি কিছুই নেই। তখন আমি ১১ সহযোদ্ধা সহ পরিবার নিয়ে ভারতের আসামে অবস্থানরত চতূর্থ ইবিআর এ যোগদানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। পথিমধ্যে হিলির কাছাকাছি স্থানে রাজাকার আল বদরদের (পাকিস্থানীদের সহযোগী) দারা সিমান্ত অতিক্রমে বাধা প্রাপ্ত হই। অমাদের লক্ষ করে গুলি ছুড়তে থাকে ওরা। পরে স্থানীয় গ্রামবাসীর সহযোগীতায় সিমান্ত অতিক্রম করতে সক্ষম হই।
সেখানেও আবার ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার হাতে আটক হই আমরা। আমাদের ইন্টাগেশনে নিয়ে গেলে প্রতিয়মান হয় যে, আমি (মেজর খালেক) ও আমার সহযোদ্ধারা সকলেই স্বাধীনতা কামী বাঙ্গালী সামরিক সদস্য।

বাংলাদেশ হতে ভারতে আশ্রয় নেয়া ১ কোটি স্মরনার্থীর মধ্যে ২৬ হাজার স্মরনার্থীর দেখভালের দায়িত্ব পাই। যার কারনে চতূর্থ ইষ্ট রেজিমেন্টে যোগদানের আর কোনও সুযোগ ছিল না। ওই দায়িত্ব পালন কালে তৎকালীন এমএলএ রিয়াজ উদ্দিন ভোলা মিয়া (সাবেক রাষ্ট্রপতি হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ এর মামা) ক্যাম্প পরিদর্শনে এলে ক্যাম্পের পরিস্থিতি দেখে তিনি মেজর আব্দুল খালেকের ভূয়শী প্রশংসা করেন এবং দায়িত্ব চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেন।

কিন্তু পরবর্তি সময়ে দেশে এসে যুদ্ধ করার যে পরিকল্পনা ছিল, সেই স্বপ্ন আমার আর পূরণ হয়ে উঠেনি। তবে আমার দেশের মানুষদের পাশে থাকতে পেরেছি এটাও আমার কাছে ছিল স্বর্গের মতো।

তার রেখে যাওয়া ৪০ পাতার ডায়রিতে আরো লেখাছিল পাক-ভারত যুদ্ধে অংশ গ্রহন আর অর্জিত পদক পাওয়ার স্মৃতিচারণ। সেই স্মতিচারণের অংশ বিশেষ তুলে ধরা হলো- ১৯৬৫ সালে যখন পাকিস্তান ভারত যুদ্ধ শুরু হয় তখন আমি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য। ভারতের বিরুদ্ধে সম্মূখ যুদ্ধে অনেক সহকর্মিকে হারিয়েছি। নিজেও মৃত্যুর মুখে থেকে কয়েকবার ফিরে এসেছি। সেই যুদ্ধে বিশেষ কৃতিত্যের জন্য তৎকালীন পাকিস্তান সরকার প্রদত্ত (ক) তমঘায়ে জং, (খ) সিতারা-এ-হার্ব ও (গ) জামহুরিয়া ইসলামিয়া পদকে ভুষিত হয়েছি।

মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত মেজর আব্দুল খালেক প্রসঙ্গে শাজাহনপুর উপজেলার সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা গৌর গোপাল গোস্বামি বলেন, যারা প্রকৃতি বীর আর দেশের জন্য কাজ করে গেছেন তারা অড়ালেই থেকে গেছেন। এটা জাতির জন্য ব্যর্থতা। তবে তিনি বলেন, আমার মনে হয় ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাদের অবির্ভাব তাকে লজ্জিত করেছে। তাই তো সব আড়ালেই রাখতে চাইতেন। দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়া এসব বীর সেনাদের আত্মা তখনি শান্তি পাবে, যখন ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাদের দেশের মাটিতে বিচার করা সম্ভব হয়।
আমার পক্ষ থেকে স্যালুট জানাই মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা অবসর প্রাপ্ত মেজর আব্দুল খালেককে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here