বগুড়াবাসিকে বলছি; লকডাউনকে তামাশা মনে করবেনা!

0
689

নওরিন শেখ:
বগুড়া শহর লকডাউন ঘোষনা করা হয়েছে গত মঙ্গলবার বিকেল ৮টা থেকে। লকডাউন কি আর করোনাভাইরাস কীভাবে ছড়ায় এটা বোধ হয় এখন সব শ্রেণির মানুষ জানেন এবং বোঝেন।

এখনও বগুড়ায় কিছু প্রতিষ্ঠান বা কারখানা চালু রেখেছেন। তার প্রধান করাণই হলো, নিজেদের স্বার্থ রক্ষা।
করোনা মোকাবেলায় বগুড়া জেলা পুলিশ সম্বন্বিত উদ্যোগে ‘ডোর টু ডোর’ কার্যক্রম শুরু করেছেন। একে কওে শহরের বাসিন্দারা ঘওে বসেই হটলাইনের মাধ্যমে নিজেদেও পণ্য কিনতে পারবেন। তাও আবার বাজার মূল্যেও চেয়ে কমদামে। এজন্য পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভুইয়া মহোদয় প্রশংসার দাবিদার।

এছাড়া বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র যেমন রাজাবাজার, সাতমাথা এলাকাসহ সকল উপজেলার হাট-বাজার ও বন্দর এলাকায় প্রতিদিনই জনসাধারণের সমাগম চলছেই। সকাল শুরু থেকেই এত জনসমাগম মনে হয় সকালে করোনা ভাইরাস কাউকে ধরবেনা! করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা সকলে বুঝেও সচেতন হচ্ছেন না।

জনসমাগম ঠেকাতে সেনাবাহিনী, জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসন তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কর্নপাত করছেন না কেউই। কিন্তু ফল যে ভালো হবে না বা হচ্ছে না সেটা বিশ্ব অলরেডি বুঝতে পেরেছে। বিশে^র সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা’। অথচ আমাদের বগুড়ার মানুষের বোধাদয় হচ্ছে না সেভাবে!

আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজারের সামনের রাস্তায় যানবাহন চলাচলের দৃশ্য । লক ডাউন শুধু নামেই। তা মানছে না কেউ।। ছবি: রেজাউল করিম রয়েল।

আতঙ্কের বিষয় দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ক্রমাগত বাড়ছে। বগুড়াতে এপর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ১২জন। ভয়াভহ ব্যপার হলো শুধু বগুড়া জেলা শহর নয় উপজেলা এবং গ্রামগঞ্জেও করোনা ছোবল মেরেছে।

আইইডিসিআরের তথ্য মতে, দেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়েছে আরও আগেই। তার মানে এখন প্রতিটি মানুষের নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থান করা জরুরি হয়ে পড়েছে। করোনা প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্বই কার্যত প্রধান ‘ওষুধ’।

করোনাভাইরাসের দুর্যোগ পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার গত ২৬ মার্চ থেকেই দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। এরপর থেকে ছুটির পরিধি বাড়ানো হয়েছে। হচ্ছেও। ছুটি ঘোষণার পর থেকে সারাদেশে অঘোষিত লকডাউন চলছে। সরকারের এই ছুটি দেয়ার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে ঘরে রাখা। অর্থাৎ কেউ ঘরের ভেতর থেকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হবেন না। তাহলে সামাজিকভাবে এই রোগ ছড়ানোর প্রভাব কমে যাবে। এতে রক্ষা পেতে পারে পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র।

এ লক্ষে সরকার পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি সারাদেশে দুর্যোগের বন্ধু সেনাবাহিনীকেও মাঠে নামিয়েছেন সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কাজে। অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করা হচ্ছে। সেনাবাহিনী এই কাজ করে যাচ্ছে নিরলসভাবে। কিন্তু করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সরকারের নেয়া এই পদক্ষেপ কেন জানি দেশের কিছু মানুষের পছন্দ হচ্ছে না! অথচ করোনায় বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাওয়ার আশঙ্কা উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়।

সরকারের পদক্ষেপ নেওয়ার পরও মানুষ ঘরে বসে থাকতে নারাজ। অকাজে বাইরে বের হচ্ছেন। পানের কিংবা পাড়ার চিপায় চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছেন হরদম। মানুষের ঘরের বাহির হওয়ার ‘প্রেম’ যেকোনোমূল্যে বন্ধ করতে হবে। এ জন্য যতোটা কঠোর হওয়া দরকার ততোটাই কঠোর হতে হবে। নইলে সামান্য ভুল বা হেয়ালিপনার জন্য চরম মূল্য দিতে হবে আমাদের এই ঘনবসিতপূর্ণ দেশ আর দেশের মানুষকে।

আমাদের দেশের মানুষের একটা বিরাট অংশ আছে যারা দিন আনে দিন খায়। খেটে খাওয়া দিনমজুর, শ্রমিক, রিকশা, ভ্যানচালক, সিএনজি অটোরিকশাচালক, পরিবহন শ্রমিক, হোটেল রেস্তোরাঁর শ্রমিকসহ এরকম আরও বেশ কিছু শ্রেণির মানুষ। এ দুর্যোগের সময় কর্মহীন হয়ে পড়া এই মানুষগুলো যেন অভুক্ত না থাকে সে জন্য সরকার তাদের জন্য খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করেছে। দেশে এখন খাদ্যের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। এক-দুই মাস সরকার এই শ্রেনীর মানুষকে খাদ্য সহায়তা দিতে পারবে। তাহলে কেন রাস্তায় ছোট ছোট যানবাহন চলবে?

বগুড়ায় লক ডাউন অবস্থা।। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯.১৫ টায় শহরের ঝাউতলা এলাকা। সড়কে জ্যাম লেগেগেছে। জনগণ মনেহয় লক ডাউন না মানার প্রতিযোগীয় নেমেছে।। ছবি: রেজাউল করিম রয়েল।

আমাদের উপর যে মহাদুর্যোগ ঘুরপাক খাচ্ছে সেটিকে দমন করতে কয়েকটা দিন আমরা কেন জরুরি সেবা বাদে অন্য সব কিছু বন্ধ রাখতে পারছি না। এটা যে করেই হোক করতে হবে। নতুবা চরমমূল্য গুনতে হবে। আমি বিশ্বাস করি এখনও সময় আছে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার। শুধু দরকার কঠোর হওয়ার। বিশ্বের অনেক দেশেই কঠোরভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া সরকার তো জানিয়ে দিয়েছে যারা আইন মানবে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর বিদেশীদের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব বাতিল করা হবে।

ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য সব দেশেই কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করে মানুষকে ঘরে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে। তাহলে আমরা কেন পারব না?
দুর্যোগের সময় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ বা সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতার বিষয়টা আমরা ভীষণভাবে দেখতে পাচ্ছি। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। দেশের বিভিন্ন জায়গায় খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে, সরকারি, বেসরকারি, এনজিও, রাজনৈতিক দল, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং ব্যক্তি উদ্যোগে।

উদহারণ হিসেবে যদি বগুড়ার কথা বলি তাহলে দেখা যাবে, এসব খাদ্য সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমন্বয় দেখা যাচ্ছে না। ফলে একই ব্যক্তি বা পরিবার কিংবা একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি প্রত্যেকের কাছ থেকে খাদ্য সহায়তা বা ত্রাণ সামগ্রী পাচ্ছেন। শুধু সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে এমন হচ্ছে। এতো উদহারণ সরুপ একটি জেলার কথা বললাম। কিন্তু এই বাস্তব চিত্র সারাদেশে। প্রতিদিনই গণমাধ্যমে খবর আসছে খেয়ে না থেয়ে দিনকাটানো অনেক মানুষের গল্প। তাই এখানেও সরকারকে কঠোর হতে হবে। তাহলে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের ক্ষেত্রে অনিয়ম দূর সম্ভব হবে।

দেশের এমন ক্রান্তিকালে গুজব বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। গত কিছু দিন দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে বিভিন্নভাবে কিছু ব্যক্তি, গোষ্ঠী, মহল থেকে নানা রকম গুজব ছড়াচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর নাম ভাঙ্গিয়ে দুই দিন আগেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক গুজব ছড়ানো হয়েছে। এ নিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে কথা বলতে হয়েছে।

সবশেষে বলব, আমাদের এই মহা দুর্যোগকালে দেশের মানুষ একজনের উপরই ভরসা রাখছে। তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। তার নেতৃত্বেই আমরা, এই বাংলাদেশ, এদেশের মানুষ এই বৈশ্বিক মহামারি থেকে রক্ষা পাবে। দেশের প্রয়োজনে তাকেও আরও কঠোর হতে হবে। তাহলেই কেবল দেশের মানুষ বাঁচবে, দেশ বাঁচবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here