‘মহাস্থান হাট’ গা ঘেঁষেই শতশত মানুষ- বিপর্যয়ের শঙ্কা

2
595
বগুড়ার মহস্থান হাটের দৃশ্য এটি। ছবিটি ৩০ মার্চ সোমবার সকালে তোলা।

আবুল কালাম আজাদ
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে মানুষকে ‘সামাজিক দূরত্ব’ (তিন ফুট দূরত্ব) বজায় রাখার নির্দেশনা দিয়েছে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ। কিন্তু বগুড়ার হাট-বাজারে সেই ‘সামাজিক দূরত্ব’ অনেকেই মানছেন না। হাট-বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতারা প্রায়ই একে অন্যের গা-ঘেঁষে দাঁড়াচ্ছেন। হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার রক্ষা করছেন না। এমনই সব দৃশ্য দেখা গেছে বগুড়ার মহস্থান হাটে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে গা ঘেঁষাঘেষি করে দাঁড়ানোর কারণে করোনা-সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
উত্তরবঙ্গের মধ্যে সবজির সবচেয়ে বড় বাজার বগুড়ার মহস্থান হাট। এটি শিবগঞ্জ উপজেলার ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক সংলগ্ন। ভোর থেকেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত সবজি এই বাজারে নিয়ে আসতে থাকেন। এসব সবজি কিনতে আসেন রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলার পাইকাররা। ভোর থেকে সবজি কিনে দুপুরের মধ্যে ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়।
স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এই বাজার থেকে প্রতিদিন অর্ধকোটি টাকার সবজি বিভিন্ন জেলায় সরবারহ করা হয়। দেশের মোট চাহিদার অর্ধেক সবজি সরবারহ হয় এই মহস্থান হাটের সবজি। এ কারণেই ভোর থেকেই বেলা ১২ টা পর্যন্ত অর্ধলাখ মানুষের সমাগম ঘটে এই বাজরটিতে।
গতকাল সোমবার সকালে মহস্থান হাটে গিয়ে দেখা গেছে, সবজি কিনতে আর বিক্রি করতে আসা শতশত মানুষের ভিড় এই বাজারে। তাদের মাঝখানে ১০ ইঞ্চি জায়গাও ফাঁকা নেই। বাজারে আসা অধিকাংশ লোকই মাস্ক ব্যবহার করেন নি। হাতে গ্লাভসও নেই। কৃষক ও পাইকারদের দোকানের মাঝখানেও তেমন দূরত্ব রক্ষা করা হয়নি। এছাড়া, ক্রেতা-বিক্রেতাকে যেখানে-সেখানে কফ-থুথু ফেলতে দেখা গেছে।
সবজি বিক্রি করতে আসা কৃষক আনোয়ার হোসেন, কাশেম আলী, মজনু প্রামানিকসহ কয়েকজনের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, তারা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে জানেন। কিন্তু ফসল বিক্রি করতে এসে পরিস্থিতির কারণে ঠিকমতো সেই দূরত্ব রক্ষা করতে পারেন না। আর হাটে এভাবে দূরে দূরে থাকার কোনো সুযোগ নেই বলে তারা মনে করেন।
তারা মনে করেন, অন্য মানুষের কারণে ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তাদের কিছু করার নেই। হাটে না আসলে জীবন তো চলবে না।
ওই হাটে দেড়মন টমেটো নিয়ে বসে রয়েছেন কৃষক গেদা মিয়া। তার মুখে মাস্ক নেই, দূরত্ব বজায় দূড়ের কথা তার গা ঘেঁষে শতশত মানুষ চলাচল করছে। সকাল ৭টার দিকে এই হাটে এসছেন তিনি। সকাল ১১টা বেজে গেলেও তার টমেটো বিক্রি হয়নি। পাইকাররা নামমাত্র দাম বলায় তিনি বিক্রি করছেন না। কথা হয় কৃষক গেদা মিয়া সঙ্গে। তিনি জানান, মাস্ক পকেটে রয়েছে। কিন্তু পাইকারদের সাথে কথা বলতে গিয়ে বাধ্য হয়ে মাস্ক খুলে রেখেছেন। আর হাটে তো দূরত্বে থাকার তো সুযোগ নেই।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পাইকার বলেন, কৃষকদের দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলেও তারা কেউ শোনেন না। মহাস্থান হাট এতো বিশাল জনসমাগম। এখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কঠিন কাজ। হাটের ইজাদার যদি কৃষদের দোকান গুলো দূরত্ব বজায় রেখে করে দেয় তাহলেই সম্ভব।
বাজার করতে আসা আমিনুর রহমান বলেন, ‘বাসার পাশেই এই হাট। তাই এলাম। হাটের জায়গাটাও বেশ বড়। তারপরও শতশত মানুষের সমাগমের কারণে তিন ফুট দূরে দূরে অবস্থান করা কঠিন। তারপরও মাস্ক, গ্লাভস ব্যবহার করছি, যেন সংক্রমণ না ছড়ায়।’
ওই ব্যক্তির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমজাদ নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘এই হাটে সবজির দাম কম। ঘুরে ঘুরে বাজার করতে হচ্ছে। যে পরিমাণ মানুষ বাজারে এসেছে, তাতে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা কঠিন।’
মাস্ক, গ্লাভস না থাকার বিষয়ে মহস্থান হাটের কয়েকজন খুচরা সবজি বিক্রেতার কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, ‘এগুলো পরলে অস্বস্তি লাগে। এজন্য ব্যবহার করি না।’
মহস্থান হাটের ইজারা এবার নিয়েছেন সাবিনা এন্টারপ্রাইজ। তবে দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছেন আজমল হোসেন। তিনি বলেন, ‘ভোর থেকে কয়েবার ঢোল পিটিয়ে সকলকে মাস্ক পড়তে বলা হয়েছে। এছাড়া হাত ধোয়ার ব্যবস্থাও কওে রাখা হয়েছে। কিন্তু দূরত্ব বজায় রাখাটা কঠিন। এছাড়া কয়েক ঘণ্টার হাট, তারপরও কেউ যদি মাস্ক না পড়ে আর কী করতে পারি?’
নিয়ম না ও সচেতনতার অভাব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আজমল হোসেন বলেন, কোভিড-১৯ প্রতিরোধের যে কয়েকটি ধাপ রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম ধাপ হলোসামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। এক গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখলে ৬০ ভাগেরও বেশি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়। করোনা একজন মানুষ থেকে অন্য মানুষে সর্বনিম্ন ৩ ফুট ও সর্বোচ্চ ৬ ফুট পর্যন্ত দূরত্বে ছড়াতে পারে। তাই মানুষে-মানুষে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাজারে যেভাবে ভিড়ের কারণে সামাজিক দূরত্বের বিষয়টি না মানলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে।’
জানতে চাইলে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আলমগীর কবির জয়যুগান্তরকে বলেন, মহাস্থান বাজার বিশাল। এখানে প্রতিদিন অনেক মানুষের সমাগম ঘটে। আমরা অভিযান চালানোর খবর পেলেই বাজার ফাঁকা হয়ে যায়। শুধু অভিযান নয়, সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে।

2 COMMENTS

  1. লেখাগুলো জাস্টিফাই করতে হবে ভাই। তাহলে পাঠকের পড়তে সুবিধা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here