‘মাটি সন্ত্রাসীদের’ কাছে রক্ষা পেল না বাড়িঘরও

0
273
ভূমিদস্যুরা বসতভিটা ঘেঁষে গভীর করে মাটি কাটার ফলে যেকোন সময় ধসে যাওয়ার আঙ্কায় বাড়িটি। এখন ওই বাড়িটি জনশূণ্য। শনিবার (১১এপ্রিল) দুপুরে বগুড়ার শাজাহানপুরের সাজাপুর গ্রামের জায়দারপাড়া থেকে তোলা।

একে আজাদ
বগুড়ার শাজাহানপুরের সাজাপুর জায়দারপাড়ায় ১৫ বছর আগের তিনটি বাড়ি ছিল। ১১ কক্ষের মাটির বাড়িতে প্রায় ২০ বাসিন্দার বসবাস করছিলেন। ছিল-ই বলতে হচ্ছে। কারণ সবই এখন অতীত। বর্তমানে সেখানে আর বাড়ি নেই। বাড়ি না থাকলে মানুষ বসবাসের প্রশ্নও নেই। না থাকার পেছনে একমাত্র কারণ ‘ভূমিদস্যুদের’ প্রভাব। ‘ভূমিদস্যু’ বা মাটি ব্যবসায়ীরা এলাকায় মাটি কেটে ভিটেমাটিও পুকুরের মতো নিচু করছেন। রক্ষা হচ্ছে না কৃষি জমিও। তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে জানিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না।
স্থানীয়রা বলছেন, বসতভিটা কেড়ে নিয়েই থেমে নেই ‘মাটি সন্ত্রাসীরা’, এখন রাতের ঘুম পর্যন্ত হারাম করে দিয়েছেন তারা। রাতভর মাটি বোঝাই ট্রাক চলাচলের বিকট শব্দে এলাকায় থাকা মুশকিল। এমন যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) বলেও কোনো সমাধান মেলেনি।

ওই ২০ জন বাসিন্দাদের মধ্যে একজন অভিযোগ করেন, ‘ইউএনও কিংবা পুলিশ জনগণের নয়। তারা মাটি সন্ত্রাসীদের পকেটের লোক।’
জায়দারপাড়ায় এলাকার ওই ২০ বাসিন্দারা এখন পাশেই কাটনাপাড়ায় বসবাস করেন। জায়দারপাড়ায় ওই গ্রাম উপেজলা মাঝিড়া ইউনিয়নে। ওই তিন বাড়ি এলাকার বাসিন্দারা বানারশি ডিপেরচরা হিসেবে চেনেন। গতকাল শনিবার দুপুরে ওই গ্রামের সরেজমিনে দেখা যায়, একটি বসবাড়ির ধ্বংশাবশেষ রয়েছে। বাড়ির দুই দিকে এখনো ফসলি জমি রয়েছে। দক্ষিণ ও পূর্বপাশের জমি কেটে গভীর করা হয়েছে। বাড়ি ঘেঁষে দুপাশে গভীর করে মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। ওখানে দিনের বেলায় ট্রাকের দেখা মিলল না। তবে অন্য সময়ে ট্রাকে করে মাটি নেওয়া হয়, এটা স্পষ্ট। কারণ মাটি কেটে নেওয়ার জায়গায় ট্রাকের চাকার অসংখ্য দাগ রয়েছে। দিনের বেলায়ও খননযন্ত্র ওই বসতবাড়িতেই রাখা হয়। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িত কারও দেখা পাওয়া যায়নি।
এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেলো এই বাড়ির একাংশের মালিক ছিলেন আবু বকর। মুঠোফোনে কথা হয় তার সঙ্গে। তার ভাষ্য, তার বাবা বেঁেচ থাকা অবস্থায় অর্থাৎ ১৫ বছর আগে ওখানে (বানারশি ডিপেরচরা) মাটির দেয়াল তুলে ১১ কক্ষের তিনটি বাড়ি নির্মাণ করেন। তবে সেখানে তিনি (আবু বকর) বসবাস করতেন না। তার অন্য ভাইয়েরা বসবাস করতেন। কিন্তু বছরখানেক আগে এই এলাকার লয়া মিয়া, শহিদুলসহ আরো কয়েকজন মিলে ওই বাড়ি ঘেঁষে খননযন্ত্র দিয়ে মাটি কাটতে শুরু করেন। তখনই শঙ্কা হয় তাদের (আবু বকরদের) বাড়ি ধসে যাবে। পরে বিষয়টি নিয়ে শাজাহানপুর থানার ওসি এবং ইউএনওকে লিখিতভাবে অবগত করেন। এরপর পুলিশ এসে ঘুরে গেছে। তবে বন্ধ হয়নি মাটি কাটা। বরং এখন চলাচলের রাস্তার মাটিও কেটে নিয়েছেন দস্যুরা। পরে স্ত্রী-সন্তানদের জীবন রক্ষায় বাধ্য হয়ে পৈত্রিক বসতভিটাটুকু গত ৬ মাস আগে তারা এক নিকটাত্মীয়র কাছে পানির দামে বিক্রি করেন।

ওই গ্রামের গৃহবধূ খাদিজাতুল কোবারা বলেন, করোনাভাইরাসের আতঙ্কে ছেলে-মেয়েদের স্কুল-কলেজে যাওয়া বন্ধ রয়েছে। সন্ধ্যার পর যে পড়তে বসবে তাও ব্যঘাত করছে মাটি বহনকারী ট্রাকগুলো। রাতে ঘুমানো কঠিন হয়ে পেেড়ছে। এখন রাত জেগে ট্রাকের শব্দ শুনতে হয়। প্রতিকার পাওয়ার উপায় নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক বলেন, ‘দুইদিন আগে রাতে মাটি কাটার বিষয়ে ইউএনও ম্যাডামকে ফোন করে বলেছিলাম। তিনি ওসি সাহেবকে জানাতে বলেন। এরপর ওসি সাহেবকেও ফোন করি। তিনি বললেন, দেখছি বিষয়টা। দেখার মধ্যেই রয়েছে এখনো।’
সাজাপুর জায়দারপাড়া থেকে মাটি কাটার অভিযোগ রয়েছে লয়া মিয়ার বিরুদ্ধে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন তিনি মাটি কাটছেন না। অন্যরা কাটছেন। তবে কারা এসব মাটি কাটছেন এমন প্রশ্নের জবাব তিনি এড়িয়ে যান। তবে শহিদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
শুধুবসত ভিটাই নয়, ওই এলাকার আশেপাশের কয়েক একর ফসলি জমি থেকে মাটি কাটার উৎসব চলছে। ধসের মুখে রয়েছে কয়েক একর ফসলি জমি।
অথচ কৃষি জমি সুরক্ষা ও ব্যবহার আইন (২০১৬) এর খসড়ায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের যে সকল কৃষি জমি রহিয়াছে, তাহা এই আইনের মাধ্যমে সুরক্ষা করিতে হইবে এবং কোনোভাবেই তাহার ব্যবহার ভিত্তিক শ্রেণি পরিবর্তন করা যাইবে না।’
এই আইন অমান্য করলে (কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান) ‘তিনি বা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী ব্যক্তিবর্গ কিংবা তাহার বা তাহাদের সহায়তা প্রদানকারী কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাগণ সর্বোচ্চ ০৩ (তিন) বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা সর্বনিম্ন ০৩ (তিন) লক্ষ টাকা পর্যর্ন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং বর্ণিত কৃষি জমি সরকার কর্তৃক বায়েজাপ্ত করা হইবে।’

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মাটির উপরিভাগের ১০-১৫ ইঞ্চির মধ্যে উর্বরতা শক্তি থাকে। তাই এসব মাটি খুঁড়ে বিক্রি করার ফলে তা পুনরায় ফিরে আসতে ১০-১৫ বছর সময় লাগে। আর বারবার তা খোঁড়া হলে এসব জমি ফসল উৎপাদনে স্থায়ীভাবে একেবারে অক্ষম হয়ে পড়ে।
সাজাপুর জায়দারপাড়ায় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, ওই এলাকা থেকে সন্ধ্যার পর থেকে মাটি কাটা শুরু হয়। সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত মাটি বোঝাই ট্রাক চলে রাস্তায়। এসব মাটি রাতভর সরবারহ করা হচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়। এ ছাড়া গ্রামের সব রাস্তা গুলোও নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। গ্রামবাসির অভিযোগ প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলছে অবৈধ মাটিকাটা।
ইট প্রস্তুত এবং ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রন) আইন- ২০১৩ তে-ও বলা হয়েছে, ইটভাটায় ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি ব্যববহার করলে প্রথম বারের মতো দুই বছরের কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা।
আইন থাকার পরও তা বস্বায়ন হচ্ছেনা শাজাহানপুর উপজেলায়। এসব লাল মাটি এক ট্রাক ৪০০ টাকা করে বিক্রি করা হচ্ছে ইটভাটাগুলোতে।
মাটিকাটার বিষয়ে জানতে চাইলে শাজাহনপুর থানার ভার প্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অজিম উদ্দিন বলেন, স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনাস্থলে গিয়ে কোনো লোক পাওয়া যায়নি। তবে পরবার্তিতে মাটি কাটার বিষয়ে আমাকে জানালে ব্যবস্থা নিব। আর আমাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন।
মাটি কাটার বিষয়ে জানতে গতকাল রাত পৌনে আটটার দিকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে বরাবরের মতোই ফোন ধরেন নি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা পারভীন। তবে জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদ মুঠোফোনে বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here