আমিরের ‘অটোমেশিন পোশাক’ করোনা চিকিৎসায় শতভাগ নিরাপদ

0
628

মাহফুজ মন্ডল, জৈষ্ঠ প্রতিবেদক:
করোনা ভাইরাস আক্রান্ত বিশ্ব মহামারিতে রুপ নিয়েছে। মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ হয় বলে এই ভাইরাসের আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে চিকিৎসকরাও মারা যাচ্ছেন। এমন এক ক্রান্তিকালে যন্ত্রচালিত অটোমেশিন পোষাক আবিস্কার করেছেন বগুড়ার যন্ত্রবিজ্ঞানী আমির হোসেন।
তার দাবি, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা এই অটোমেশিন পোষাক। তার উদ্ভাবিত এই পোষাক চিকিৎসা কাজে ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিটের (আইসিইউ) আদলে তৈরি করা। ফলে এই পোষাক ব্যবহার করে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের নিরাপদে চিকিৎসা দিতে পারবেন ডাক্তার ও নার্সরা।
আর এই অটোমেশিন পোষাক ব্যবহার করে করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা দেয়া হলে চিকিৎসক কিংবা নার্সেদের আক্রান্তের আশঙ্কা কম। সবসময় সম্পূর্ন নিরাপত্তার মধ্যে থাকবেন চিকিৎসকগণ। নির্ভয়ে তারা করোনায় আক্রান্ত রোগীর সামনে কাজ করতে পারবেন। অটোমেশিন পোষাক এতে বিশেষ কার্যকর বলে জানালেন আমির।
আমির হোসেন বলেন, বিশেষ প্রযুক্তিতে তৈরি এই পোশাকের ভিতর থেকেই যন্ত্রের মাধ্যমে কথা বলতে পারবেন চিকিৎসক কিংবা নার্সরা, যা স্পিকারের মাধ্যমে বাহিরে সবাই শুনতে পারবেন।
আমিরের ভাষ্য, এ যন্ত্রের মধ্যে আপনা-আপনি অক্সিজেন তৈরি হবে। এবং তা থেকে পুরো পোশাকে ছড়িয়ে পড়বে। এতে পোশাকের ভিতরের মানুষ সহজেই নিঃশ্বাস নিতে পাবরেন।
যন্ত্রবিজ্ঞানী আমির হোসেন আরও দাবি করেন, এই মেশিনটি সম্পূর্ণ আইসিইউ-এর আদলেই তৈরি করার করণে করোনা ভাইরাস ছাড়াও জন্ডিস, যক্ষা, ডেঙ্গু-জ্বরসহ সকল ছোয়াচে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহার করা যাবে। এতে ছোয়াচে রোগ বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে।
আমির জানান, এই যন্ত্রটির প্রতিটি হাসপাতাল, ক্লিনিকে সংযোগ করলে এতে করে চিকিৎসার মান আরোও উন্নত ও সহজ হবে। দীর্ঘদিন এই পোশাক শরীরে রাখা যাবে। স্বাস্থ্যগত কোনো ক্ষতি হবে না। এই পোশাক জিবাণুমুক্তকরণ যন্ত্র তৈরি কাজেও তিনি হাত দিয়েছেন।
এই বিজ্ঞানাী দাবি করেন, সারাদিনে চলাফেরার কারণে মানুষ কিংবা চিকিৎসকদের পোশাকে জিবাণু লেগে যায়। পোশাকের গায়ে লেগে থাকা জিবাণুমুক্তকরণ ব্যবস্থা এখনো পর্যন্ত হয় তৈরি হয়নি। তাই এমন যন্ত্র তৈরি করা হচ্ছে, যাতে মেশিনে মধ্যে ৩০ সেকেন্ড ঢুকে আবার বেরিয়ে আসলে সম্পূর্ণ জিবাণুমুক্ত হয়ে যাবে খুব সহজেই।
আমির হোসেন জানান, অর্থনৈতিক সহযোগিতা পেলে জীবানুমুক্তকরণ এই যন্ত্র আবিস্কার করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা যাবে। এরপর অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে ভেন্টিলেটর যন্ত্র তৈরির কাজে নেওয়া হবে। উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ দিয়ে কাজ শুরু করে প্রায় ৪০ ভাগ এগিয়েছেন। এ জন্য অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা দরকার।

কে এই আবিষ্কারক আমির
পুরো নাম আমির হোসেন। তার বাবা বগুড়া শহরের ঠিকাদারপাড়া লেনের ধলু মেকার প্রথম ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ গড়ে তোলেন ১৯৪০ সালের দিকে। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় তৎকালীন বগুড়ার ডিসির নির্দেশে ধলু মেকার সতর্কতামূলক সাইরেন মেশিন তৈরি করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। এই ধলু মেকার নিজেই হস্তচালিত লেদ মেশিন তৈরি করে বগুড়াসহ উত্তরবঙ্গে আলোচনায় আসেন। তিনি ১৯৮৮ সালের ১৩ নভেম্বরে মারা যাওয়ার পর রহিম ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের দায়িত্ব নেন ছেলে আমির হোসেন। বর্তমানে ওয়ার্কশপটি ওই এলাকায় রয়েছে।
আমির হোসেনের হাতেখড়ি হয় তার বাবা ধলু মেকারের কাছে। ধলু মেকারের আট ছেলেমেয়ের মধ্যে আমির হোসেন চতুর্থ। বাবার মৃত্যুর পর থেকেই শুরু হয় গবেষণা। প্রকৌশলী আমির হোসেন ২০০৩ সালে বুয়েট থেকে বিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি ও জিটিজেড থেকে কৃষি সামগ্রী উদ্ভাবনের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। এ কাজে আমির হোসেনকে সাহায্য করেন তার দ্বিতীয় মেয়ে আসমা খানম আশা ও তৃতীয় মেয়ে তাহিয়া খানম। এ পর্যন্ত তিনি দেশি-বিদেশি অনেক পুরস্কার ও সনদ পেয়ে খ্যাতি লাভ করেছেন।
জ্বালানিবিহীন গাড়ি: দীর্ঘ এক বছর গবেষণার পর তিনি এ কাজে সফল হন। তার উদ্ভাবিত পাঁচ আসনবিশিষ্ট এবং ২৫০ কেজি ওজন ক্ষমতাসম্পন্ন গাড়িটি চালাতে কিছুই লাগে না। না মবিল তেল, না গ্যাস। বিশেষ করে গাড়িটির ব্যাটারি মাত্র একবার চার্জ দিলেই পরিপূর্ণভাবে সম্পূর্ণ হয়ে যায় এবং গাড়িটি চালিত অবস্থায়ও চার্জ হতে থাকে। সবমিলিয়ে, মাত্র ২৫ টাকায় আট ঘণ্টা চলার খোরাক হয়ে যায় এই গাড়িটিতে। গাড়িটির গতিশক্তির উৎস হিসেবে ৬০ ভোল্ট বৈদ্যুতিক টারবাইন মোটর ব্যবহার করা হয়েছে।
অটোব্রিকস মেশিন: ২০০৩ সালে আমির হোসেন বানিয়েছেন অটোব্রিকস তৈরির মেশিন, যা চীনের তৈরি অটোব্রিকস মেশিনের চেয়ে উন্নত। এই মেশিনটি চলতি বছর আরো আধুনিক করা হয়েছে। আগে তৈরি করা মেশিনটি বিদ্যুৎ ও শ্যালো মেশিন দিয়ে চলত। এবারেরটি বিদ্যুৎ ছাড়া।
ধানকাটা মেশিন : হালকা ও সস্তা ধান কাটার মেশিন তৈরি করেছেন প্রকৌশলী আমির হোসেন। দুই ঘণ্টায় এক বিঘা জমির ধান কাটা যাবে এ মেশিন দিয়ে। খরচ হবে দুই লিটার পেট্রোল। যন্ত্রটির বৈশিষ্ট্য হলো- ধানের গাছ যে অবস্থায় থাক না কেন সে অবস্থায়ই কাটা যায়।
অটো জৈব ও মিশ্র সার : অটো জৈব ও মিশ্র সার মেশিন তৈরি করে সারাদেশে ব্যাপক আলোচনায় এসেছেন আমির হোসেন। এ জৈব ও মিশ্র সার তৈরির মেশিনটি ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও দিনাজপুর জেলায় ব্যবহৃত হচ্ছে। সুফলও পাচ্ছেন সাধারণ কৃষকরাও।
ফিশ ফিড ও পোলট্রি ফিড : আধুনিক মানে তৈরি করেছেন ফিশ ফিড ও পোলট্রি ফিড। এর মধ্যে রয়েছে অটো মেশিন, যার সুফল দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ফিশ ও পোলট্রি ফিড ব্যবসায়ীরা ভোগ করতে শুরু করেছেন।

ভুট্টা মাড়াই মেশিন : এই মেশিনটি দিয়ে ঘণ্টায় ৫০ মণ ভুট্টা মাড়াই সম্ভব। বিদ্যুৎ এবং ডিজেল উভয়চালিত যন্ত্র এটি।
পাট প্রক্রিয়া জাতকরণ মেশিন : এটি বিদ্যুৎ এবং ডিজেল উভয় চালিত মেশিন। এই মেশিন পাটকাঠি থেকে পাটের আঁশ নিখুঁতভাবে আলাদা করে ফেলে।
পাম প্রসেসিং মেশিন : এটি দিয়ে খুব সহজে পাম ফল প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব। এতে করে পাম থেকে তেল উৎপাদন সম্ভব।
আমির হোসেন জানান, অনেক কিছুই তিনি নিজ উদ্যোগে তৈরি করেছেন। এগুলো করতে গিয়ে কখনো গচ্ছিত টাকা, কখনো স্ত্রীর গয়না বিক্রি, কখনো ঋণ করতে হয়েছে। কিন্তু সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা বা সহযোগিতা পাননি। এমনকি ব্যাংকও এসব গবেষণা কাজে কোনো সহযোগিতার হাত বাড়ায়নি। আর এসব যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনের ফলে বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে আর আমদানি করতে হবে না।
তিনি মনে করেন, যারা নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে চায় তাদের জন্য সুদবিহীন ঋণের ব্যবস্থা করা উচিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here