দৃষ্টি২৪ডেস্ক: চীনে করোনা ভাইরাস (কভিড-১৯) সংক্রমণ ঝুঁকি অত্যন্ত কম বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। নিউজিল্যান্ড আজ বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তারা লকডাউন শিথিল করা নিয়ে কাজ করছে। আগামী সপ্তাহ থেকেই সেখানে প্রায় স্বাভাবিক জীবন যাপন দেখা যেতে পারে। করোনায় জর্জরিত অনেক ইউরোপীয় দেশগুলোও একে একে সেই পথে হাঁটছে। বিশ্বজুড়ে সরকাররা করোনা নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে যাচ্ছেন। একইসময়ে দেখা দিচ্ছে, দ্বিতীয় দফা করোনা সংক্রমণের। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা লকডাউন শিথিলের মধ্যে ফের বাড়তে পারে করোনা সংক্রমণ।

বার্তা সংস্থা এপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে অনেক দেশই দ্বিতীয় দফায় করোনা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে দেশটির প্রায় অর্ধেক রাজ্যে শিথিল করা হয়েছে লকডাউন। ঘর ছেড়ে বের হতে অস্থির হয়ে উঠছে মানুষ। অনেক রাজ্যে চলছে ব্যাপক পরীক্ষা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফের করোনা সংক্রমণ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করতে এ পরীক্ষা আবশ্যক। অনেক রাজ্যের গভর্নরদের উপর লকডাউন শিথিলের চাপ বাড়ছে। বিদ্যমান সরকারি নির্দেশনা অনুসারে, কোনো রাজ্যে লকডাউন শিথিলের আগে অন্তত টানা ১৪ দিন সংক্রমণ নিম্নমুখী হতে হবে। সে কোটা নিশ্চিতে পরীক্ষা ছাড়া উপায় নেই।

ওয়াশিংটন-ভিত্তিক কায়সার ফ্যামিলি ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক জশ মিশ্যাউড বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ না করে লকডাউন শিথিল করা হলে সংক্রমণ ও মৃত্যু আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। উল্লেখ্য, কায়সার ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন যুক্তরাষ্ট্রের নানা স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নীতিমালায় দেশটির ভূমিকা নিয়ে কাজ করে।

এপি জানায়, বর্তমানে প্রতিদিন যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে ২০ হাজারের বেশি মানুষ করোনা আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হচ্ছেন। একইসঙ্গে প্রতিদিন আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন ১ হাজারের বেশি। গবেষকরা সম্প্রতি জানিয়েছেন, আগস্টের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে করোনা-সংক্রান্ত কারণে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৩৪ হাজারে পৌঁছতে পারে। জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির হিসাব অনুসারে, দেশটিতে এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৭৩ হাজারের বেশি মানুশ। আক্রান্ত হয়েছেন ১২ লাখ ২৮ হাজারের বেশি। অন্যদিকে, ইউরোপে মারা গেছেন ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ।

চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য প্রশাসন বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, সেখানে নতুন করোনা আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন মাত্র দুজন। তারা উভয়েই বহিরাগত। স্বাস্থ্য প্রশাসন আরো জানায়, দেশটিতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এখন অত্যন্ত নিচু পর্যায়ে আছে। গত তিন সপ্তাহ ধরে সেখানে করোনায় আক্রান্ত হয়ে কোনো মৃত্যু হয়নি। উল্লেখ্য যে, গত বছর চীনের উহান থেকেই ভাইরাসটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে, নিউজিল্যান্ডের কঠোর লকডাউন শিথিল করা হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন জানিয়েছেন, আসন্ন সপ্তাহগুলোতে তা আরো শিথিল করা হবে। তিনি জানান, নিউজিল্যান্ড তাদের সীমান্ত বন্ধ রাখবে। তবে লোকজনকে বাইরে বের হতে দেয়া হবে; পেশাদার খেলার আয়োজন করা হবে, তবে মাঠে থাকবে না কোনো দর্শক; খুলে দেয়া হবে রেস্টুরেন্ট ও স্কুল। যদিও শতাধিক ব্যক্তির বেশি জমায়েত নিষিদ্ধ থাকবে।
আরডার্ন বলেন, আমরা এখন নিজেদের এভারেস্টের অর্ধেক নেমে এসেছি বলে মনে করছি। কেউ ফের সেই উচ্চতায় উঠতে চায় না।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মধ্যে, জার্মান সরকার করোনার পুনরুত্থান ঠেকাতে কৌশল নির্ধারণে কাজ শুরু করেছে। ইতালিতে বিশেষজ্ঞরা নতুন আক্রান্তদের শনাক্ত করতে চেষ্টা জোরদার করেছে। ফ্রান্স এখনো তাদের লকডাউন শিথিল করেনি। তবে ইতিমধ্যেই নতুন করে সংক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

জন হপকিন্স অনুসারে, এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ২ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি প্রাণ কেড়ে নিয়েছে করোনা। আক্রান্ত করেছে ৩৭ লাখের বেশি মানুষকে। তবে মৃত ও আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা আরো কয়েকগুণ বেশি বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। সীমিত পরীক্ষা, মৃতদের হিসাবে ভুল ও তথ্য ধামাচাপা দেয়ায় প্রকৃত সংখ্যা জানা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এক শতাব্দী আগে স্প্যানিশ ফ্লু মহামারি পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ওই ফ্লু’র দ্বিতীয় দফা সংক্রমণ প্রথম দফার তুলনায় অধিক প্রাণঘাতী ছিল। এর পেছনে অন্যতম কারণ ছিল, সরকারের প্রথম দফা সংক্রমণ শেষে অবাধ গণজমায়েতের অনুমোদন দিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে কিছু রাজ্য এখনো সতর্ক পন্থা অবলম্বন করছে। তবে বেশিরভাগ রাজ্যই অচল হয়ে পড়া অর্থনীতি চাঙ্গা করতে লকডাউন শিথিলের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। গত শতকের ত্রিশের দশকের সৃষ্ট মহামন্দার পর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন বিশ্ব। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থনীতি বাঁচাতে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প লকডাউন তুলে নেয়ার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনো লকডাউন তুলে নেয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি দেশটিতে। সেখানে আক্রান্ত শনাক্ত ও তাদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের দ্রুত খুঁজে বের করার মতো স্বাস্থ্যকর্মী নেই।

কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইনফেকশন অ্যান্ড ইমিউনিটির পরিচালক ড. ইয়ান লিপকিন বলেন, আমরা এমনভাবে পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছি, যেটা অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। তিনি সতর্ক করেন, এই মুহূর্তে বার, রেস্তোরাঁ, কনসার্ট, ক্রীড়া অনুষ্ঠান উন্মুক্ত করে দেয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here